‘প্রথম দিন গত শনিবার আমাদের জাহাজের খুব কাছেই একটি তেলের ডিপোতে বোমা বিস্ফোরণ হয়। আতঙ্কে সবাই জাহাজের নিরাপদ কক্ষে ছুটে যাই। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই দূর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনছি। আকাশে দফায় দফায় ড্রোন ও মিসাইলের ধ্বংসলীলা দেখা যাচ্ছে। বোমা বিস্ফোরণের আতঙ্ক–সতর্কতার মধ্যেই দিন কাটছে আমাদের।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানরত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ থেকে এভাবেই যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন জাহাজটির মাস্টার মো. শফিকুল ইসলাম খান। আজ বুধবার দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।
গত শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগের দিন আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রথমে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে গত সোমবার আবার পণ্য খালাস শুরু হয়েছে।
মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে। আমাদের জাহাজ থেকে ২০–৩০ কিলোমিটার দূরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে ভয় বেশি ছিল, তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি। কারণ, এখন বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় নিয়মিত শোনা যাচ্ছে।’
মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, জাহাজে সব নাবিকই সতর্ক অবস্থায় আছেন। কোনো হামলা হলে বা আশপাশে বিস্ফোরণ ঘটলে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়ে আগেই পরিকল্পনা করা আছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে বলে জানান তিনি। শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পণ্য খালাস শেষ হলেও পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার সুযোগ না–ও থাকতে পারে। জেবেল আলী বন্দরে এখন বিপুলসংখ্যক জাহাজ রয়েছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কী হবে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।’
মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রথম দিনের বিস্ফোরণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন নিয়মিত যোগাযোগ করছে। জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক স্যার প্রতিদিন কয়েকবার যোগাযোগ করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’
চাঁদপুরের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম খানের পরিবার বর্তমানে কুমিল্লায় থাকে। সেখানে তাঁর মা, স্ত্রী ও সন্তানেরা রয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তা করবে, সেটি স্বাভাবিক। তাই তাঁদের আশ্বস্ত রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। জাহাজের অন্য নাবিকেরাও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
এর আগে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’। ওই হামলায় জাহাজটির প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন। পরে জাহাজে আটকে পড়া ২৮ বাংলাদেশি নাবিককে উদ্ধার করা হয়।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যেমন খাবার বিল ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। নাবিকদের মনোবল চাঙা করতে এমন নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।