বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পেয়ে মাতবর ক্ষুব্ধ, ছাড়পত্র নিল ২৬ শিশুশিক্ষার্থী
ফরিদপুরের সদরপুরে ভাষানচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হঠাৎ ২৬ শিক্ষার্থী ছাড়পত্র (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) নিয়েছে। কয়েক দিন ধরে তারা বিদ্যালয়ে আসেনি। পরে তাদের অভিভাকেরা এসে ছাড়পত্র নিয়ে গেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকেরা অভিযোগ করেছেন, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধনে দাওয়াত না দেওয়ায় কামরুল হাসান নামের স্থানীয় প্রভাবশালী একজন মাতবর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি অভিভাবকদের ওপর চাপ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করেন। পরে শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়েছে। আজ রোববার পর্যন্ত বিদ্যালয় থেকে অন্তত ২৬ শিক্ষার্থীর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
কামরুল হাসান (৪৩) মধুখালীতে অবস্থিত ফরিদপুর চিনিকলের ইক্ষু উন্নয়ন কর্মকর্তা। তিনি ফরিদপুর শহরে থাকেন। তাঁর বাড়ি সদরপুরের ভাষানচরের নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী গ্রামে। ওই বিদ্যালয় পাশের চাঁদপুর কোলচুরী গ্রামে অবস্থিত।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ নির্মাণকাজ উদ্বোধনের বিষয়টি জানায়। ফলে অনুষ্ঠানে কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়নি। এতে ক্ষুব্ধ হন পাশের গ্রামের বাসিন্দা মাতবর কামরুল হাসান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী খান বলেন, ‘ভবনের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ আমাদের জানায়। ফলে আমরা কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বিষয়টি আমি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।’
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে ৪ জন শিক্ষক ও ১০৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। নতুন ভবন উদ্বোধনের আগে নিয়মিত ৬৫ থেকে ৭০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকত। চার দিন ধরে বিদ্যালয়ে ২৫ থেকে ৩০ শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকেরা।
বিদ্যালয়ের অন্তত ছয়জন অভিভাবকের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, বিদ্যালয় ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন সোমবার রাতে কামরুল হাসানের বাড়ির পাশে নুর ইসলামের দোকানে সবাইকে নিয়ে সভা হয়। সেখানে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ওই স্কুল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে নির্দেশ দেন কামরুল হাসান। তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাঁর বিরোধিতা করতে সাহস পাননি।
এ বিষয়ে কামরুল হাসান বলেন, ওই বিদ্যালয় পড়াশোনা হয় না বলে হয়তো অভিভাবকেরা সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করতে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র নেওয়ার সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো শত্রুতা করে এ কথা বলছে। এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’
চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব দিকে দেড় কিলোমিটার দূরে চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ দিকে দুই কিলোমিটার দূরে চর চাঁদপুর ভাষান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত।
চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভগীরথ বিশ্বাস জানান, ওই বিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৭ শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে এ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছিল। পাঁচজনকে ভর্তি করা হয়েছে। ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে ভর্তি করা হয়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রহমান বলেন, ‘বছরের শেষ সময়ে শিশুদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে না নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়েছি; কিন্ত তাঁরা শোনেননি। পরে ইউএনওর নির্দেশে ছাড়পত্র দিয়ে শিশুদের অন্য স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।’