কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকবাহী নৌকা ডুবে দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেব যা জানা গেল

গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যাওয়া নৌকা। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসকের বাসভবন এলাকায়ছবি: সুপ্রিয় চাকমা

রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের জেলা প্রশাসকের বাসভবন এলাকায় গাছের গুঁড়ি থাকার সংকেতচিহ্ন না থাকায় পর্যটকবাহী নৌকাডুবি ঘটেছে। এ ছাড়া পর্যটকদের লাইফ জ্যাকেট ছিল না। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নৌকায় তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এই নৌকাডুবি ঘটনায় দুজন পর্যটকের মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন চায়না রানী বর্মণ ও পুষ্প রানী বর্মণ। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। হতাহত ব্যক্তিরা সবাই জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুরের বাসিন্দা। গতকাল সকালে তাঁরা রাঙামাটি বেড়াতে আসেন।

এমন নৌকায় সাধারণত ২০ থেকে ৪০ জনের মতো উঠতে পারে। পর্যটকেরা কেউ লাইফ জ্যাকেট পরেননি। আশপাশের লোকজন দ্রুত উদ্ধারে এগিয়ে না এলে হতাহত আরও অনেক বেশি হতো।
মো. হাকিম মিয়া, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও জেলা প্রশাসকের বাসভবনের কর্মচারী

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝুলন্ত সেতু এলাকা থেকে রিজার্ভ বাজারে যাওয়া পথে জেলা প্রশাসকের বাসভবন এলাকায় পৌঁছালে পর্যটকবাহী নৌযানটি গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে নৌযানটির তলায় বড় ছিদ্র হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকায় পানি উঠে তলিয়ে যায়। এ সময় পর্যটকদের চিৎকারে আশপাশের নৌকা ও সাধারণ মানুষ ছুটে গিয়ে তাঁদের উদ্ধারে চেষ্টা করে। ধারণক্ষমতা চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়ায় নৌকাটি আরও দ্রুত তলিয়ে যায়। তা ছাড়া নৌকায় থাকা ৬৩ জন পর্যটকের কেউ লাইফ জ্যাকেট পরেননি বলে জানা গেছে।

শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদে হাজার হাজার গাছে গুঁড়ি জেগে ওঠে। আজ মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটির ডিসি বাংলো এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

নৌকর মালিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলো (বাসভবন) এলাকা, অর্থাৎ পুরোনো রাজবাড়ি এলাকায় অসংখ্য গাছের গুঁড়ি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু গাছের গুঁড়ি পানির উচ্চতা থেকে কয়েক ফুট ওপরে আছে। এ ছাড়া অসংখ্য গাছের গুঁড়ি পানির এক থেকে তিন ফুট নিচে রয়েছে। যেসব গাছের গুঁড়ি পানির নিচে রয়েছে, সেগুলো দেখা যায় না। চিহ্নিত করার জন্য কোনো সংকেতও দেওয়া হয়নি। শুধু জেলা প্রশাসকের বাসভবন এলাকা নয়, শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদে হাজার হাজার গাছে গুঁড়ি জেগে ওঠে। কিছু এলাকায় লাল পতাকা দিয়ে সংকেত দেওয়া হলেও অধিকাংশ এলাকায় দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের নৌযানঘাটের সভাপতি মো. রমজান আলী বলেন, এখন কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য গাছের গুঁড়ি ভেসে উঠেছে। পর্যটকবাহী নৌযান চলাচলের চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। গাছের গুঁড়িগুলোর স্থানে চিহ্নিত সংকেত দেওয়া জরুরি বলে তিনি জানান।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জেলা প্রশাসকের বাসভবনের কর্মচারী মো. হাকিম মিয়া বলেন, নৌকাটি মাঝারি আকারের ছিল। এমন নৌকায় সাধারণত ২০ থেকে ৪০ জনের মতো উঠতে পারে। তবে এই নৌকায় অতিরিক্ত মানুষ তোলা হয়েছিল। পর্যটকেরা কেউ লাইফ জ্যাকেট পরেননি। আশপাশের লোকজন দ্রুত উদ্ধারে এগিয়ে না এলে হতাহত আরও অনেক বেশি হতো।

ঘটনার পর থেকে দুর্ঘটনাকবলিত নৌকার চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রিজার্ভ বাজার ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমবায় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোহেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কাপ্তাই হ্রদে পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর যেভাবে গাছের গুঁড়ি জেগে ওঠে, তাঁদের পক্ষে সব কটি চিহ্নিত করে সতর্কসংকেত দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রিজার্ভ বাজার থেকে ঝুলন্ত সেতু পর্যন্ত গাছের গুঁড়ির সংকেতচিহ্ন দেবেন।

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. শওকত আকবর প্রথম আলোকে বলেন, নৌদুর্ঘটনায় নিহত দুই ব্যক্তিকের স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়েছে। আহত যাত্রীরা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁরা সবাই শঙ্কামুক্ত বলে তিনি জানান।

জানতে চাইলে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পানির নিচে গাছের গুঁড়ির থাকার বিষয়টি নিয়ে তিনি বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দ্রুত কাপ্তাই হ্রদের এসব গাছের গুঁড়ি চিহ্নিত করে দেওয়া হবে। অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া ও লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলকভাবে পড়ার বিষয়ে প্রশাসন সব সময়ই কঠোর।