এলাকায় ফলন কমেছে, চট্টগ্রামে গিয়ে তরমুজ চাষ করছেন নোয়াখালীর কৃষকেরা

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চরজুড়ে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কয়েক শ টংঘর। চরের বিস্তীর্ণ জমিতে কোথাও সারি করে তরমুজের বীজ বপনের মাদা তৈরি করা হচ্ছে, কোথাও চলছে দল বেঁধে বীজ বপনের কাজ। আবার টংঘরে রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত দেখা যায় অনেক কৃষককে।

মিরসরাইয়ে চরের জমিতে তরমুজ চাষাবাদে ব্যস্ত নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা থেকে আসা কয়েকজন কৃষক। সম্প্রতি উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নেছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় চরগুলোতে যে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজের চাষ হতে পারে, তা চার-পাঁচ বছর আগেও স্থানীয় মানুষদের কল্পনায় ছিল না। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অবাক করে দিয়ে চার বছর ধরে চরের এসব জমিতে তরমুজ চাষ করে সফলতার মুখ দেখছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা থেকে আসা কৃষকেরা। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে চরের জমি ইজারা নিয়ে তাঁরা তরমুজের চাষ করে আসছেন। চলতি মৌসুমেও তরমুজ চাষ শুরু হয়েছে মিরসরাই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ছয় হাজার একর জমিতে। আর এই কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন সুবর্ণচরের প্রায় সাত হাজার কৃষক।

সম্প্রতি মিরসরাই উপজেলার সাহেরখালী, মিঠানালা, ইছাখালী, দুর্গাপুর, ধুম ও হিঙ্গুলী ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চরজুড়ে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কয়েক শ টংঘর। চরের বিস্তীর্ণ জমিতে কোথাও সারি করে তরমুজের বীজ বপনের মাদা তৈরি করা হচ্ছে, কোথাও চলছে দল বেঁধে বীজ বপনের কাজ। আবার টংঘরে রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত দেখা যায় অনেক কৃষককে। সকাল-সন্ধ্যা তরমুজ চাষিদের হাঁক–ডাকে মুখর হয় চারপাশ। সবচেয়ে বেশি তরমুজের চাষ হয়েছে মিঠানালা ও ইছাখালী ইউনিয়নে। এর মধ্যে এককভাবে মিঠানালা ইউনিয়নের কুলেরচর ও উত্তরের চরেই তরমুজ চাষ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার একর জমিতে।

স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ছয় মাসের জন্য প্রতি একর জমি ২০ হাজার টাকায় ইজারা নেওয়া হয়েছে। জমি চাষ, বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক, পরিবহন ও খাওয়া খরচসহ এক একর জমিতে তরমুজ চাষ করতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। ফলন ভালো হলে প্রতি একরে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সুবর্ণচরের কৃষক।

উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের বানাতলী জেলেপাড়াসংলগ্ন চরে গিয়ে কথা হয় তরমুজচাষি মোহাম্মদ আবদুল্লার সঙ্গে। সুবর্ণচর উপজেলার চর জুবলি ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কালামের হয়ে তিনি মিরসরাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজের চাষ করেছেন। তিনি জানান, একসময় সুবর্ণচর উপজেলার চর জুবলি, চর জব্বার, চর ভাটা ও চর আমানুল্লাহতে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করতেন তাঁরা। পরপর কয়েক বছর তরমুজ চাষ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে সুবর্ণচরের জমিতে এখন ভালো ফলন হয় না। তাই বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে তিনিসহ অনেক কৃষক তরমুজ চাষ করছেন। মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় চার বছর ধরে মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় এলাকায়ও তরমুজের চাষ করা হচ্ছে।

কৃষক আবদুল্লাহ আরও জানান, ২০২২ সালে প্রথম মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের চরে তরমুজ চাষ করেন তাঁরা। ভালো ফলনে লাভবান হওয়ায় পরের বছর ইছাখালী ইউনিয়নের পাশাপাশি সাহেরখালী ইউনিয়নেও চাষাবাদ করা হয়। ২০২৪ সালে এই চরগুলোর অন্তত তিন হাজার একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। তবে সেবার ফল উত্তোলনের সময় ভারী বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষকেরা। এবার নভেম্বর মাসের শেষের দিক থেকে তরমুজ চাষে কৃষকেরা মাঠে নামছেন।

চাষাবাদের সুবিধার্থে চরের জমিতে ত্রিপল দিয়ে ঘর নির্মাণ করে থাকছেন সুবর্ণচরের কৃষকেরা। সম্প্রতি মিরসরাইয়ের মিঠনালা ইউনিয়নের বানাতলী জেলেপাড়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

কৃষক আবদুল্লাহ তত্ত্বাবধানে মিরসরাইয়ের চরের ৩৫ একর জমিতে চাষ হচ্ছে বলে জানান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তরমুজ চাষ করি। স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ছয় মাসের জন্য প্রতি একর জমি ২০ হাজার টাকায় ইজারা নেওয়া হয়েছে। জমি চাষ, বীজ, সার-কীটনাশক, শ্রমিক, পরিবহন ও খাওয়া খরচসহ এক একর জমিতে তরমুজ চাষ করতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। ফলন ভালো হলে প্রতি একরে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে।’

কৃষকেরা জানান, কৃষি ব্যাংক ও স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি শহরের আড়তদারদের কাছ থেকেও তাঁরা আগাম টাকা নিয়ে তরমুজের চাষ করেন। এ বছর তরমুজ চাষের জন্য মিরসরাইয়ের মিঠানালা ও ইছাখালী ইউনিয়নের চরগুলোতে ৪০০ টংঘর তৈরি করে প্রায় ৭০০০ কৃষক অবস্থান করছেন। এবার চাষাবাদ শুরুর পর থেকেই সারসংকট দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।

মিরসরাইয়ের হাসিম নগর এলাকার কৃষক মো. দিদারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তরমুজ চাষের পদ্ধতি আমাদের এলাকার কৃষকদের জানা নেই বলে আগে এখানে কখনো তরমুজ চাষ হয়নি। কয়েক বছর ধরে সুবর্ণচর থেকে আসা হাজার হাজার কৃষক এখানকার চরগুলোতে জমি ইজারা নিয়ে তরমুজ চাষ করছেন। এ বছর আরও বড় পরিসরে চাষ হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার দুই ফসলি জমিগুলোর বড় একটি অংশে আগে আমন ধান, ডাল ও শর্ষে চাষ হতো। পতিত জমিগুলো গোচারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন চরের সব জমি তরমুজ চাষের আওতায় চলে আসায় আমরা চারণভূমির সংকটে পড়েছি।’

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, সুবর্ণচর উপজেলার কৃষকদের হাত ধরে মিরসরাইয়ে প্রতিবছরই তরমুজের চাষ বাড়ছে। এ বছরও উপজেলার মিঠানালা ও ইছাখালী ইউনিয়নের চরগুলোতে কয়েক হাজার একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকার মাটি ও আবহাওয়া চাষের উপযোগী হওয়ায় সুবর্ণচরের তরমুজ চাষিরা এখানে তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

প্রতাপ চন্দ্র রায় আরও বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছি। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদেরও তরমুজ চাষে আগ্রহী করার চেষ্টা করছি। এ বছর সুবর্ণচরের কৃষকদের পাশাপাশি মিরসরাই উপজেলার স্থানীয় কৃষকরাও কিছু তরমুজ চাষ করেছেন।’

জানতে চাইলে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, সুবর্ণচরে জমির ইজারা মূল্য আগের তুলনায় বেড়েছে। তাই অনেক তরমুজ চাষি অন্য এলাকায় গিয়ে চাষাবাদ করছেন। একই জমিতে বারবার তরমুজ চাষ করলে ফলন কিছুটা কমে, কৃষকেরা অন্য এলাকায় যাওয়ার এটিও একটি কারণ। তবে এসবের প্রভাবে সুবর্ণচরে আবাদ কমছে, সেটি বলা যাবে; বরং গতবারের তুলনায় এবার বেশি জমিতে তরমুজ চাষ হচ্ছে।