‘ভোটের পর কিছু কি বদলাবে’

নৌকায় যাত্রীর অপেক্ষায় মাঝি মো. আনোয়ার। গত রোববার সকাল নয়টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

শীতের সকাল। নদীর তীরে বেঁধে রাখা হয়েছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় যাত্রীর অপেক্ষায় রয়েছেন মাঝি মো. আনোয়ার (৬২)। কিছুক্ষণ পরপর বইঠা নাড়ছেন। গত রোববার সকাল নয়টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা এলাকায় হালদা নদীর পাড়ে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে।

আনোয়ার বলেন, নদীর ওপারে রাউজান। দুই পারে যাত্রী আনা-নেওয়া করেন তিনি। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে নেন ২০ টাকা করে। পুরো দিনে ছয় থেকে সাতজনের বেশি যাত্রী হয় না। আয় কম হলেও এই বয়সে আর পেশা পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই নৌকা নিয়েই চলছে তাঁর জীবন-জীবিকা। টুকটাক কথার পর আসে ভোটের প্রসঙ্গ। বইঠা হাতে মাঝি আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন,‘ভোট অবশ্যই দেব, এরপর আমাদের কী হবে? ভোটের পর কিছু কি বদলাবে?’

দুই মেয়ে, এক ছেলে, স্ত্রী নিয়ে পাঁচজনের সংসার আনোয়ারের। এই তথ্য জানিয়ে তিনি ফিরলেন ভোটের কথায়। বললেন, ‘ভোট দিলে কি খেয়ে-পরে বাঁচতে পারব? চাল, ডাল, তেলসহ জিনিসপত্রের দাম কি কমবে?’ আনোয়ারা জানালেন, ২০০৮ সালের পরের নির্বাচনগুলোয় ভোট দিতে পারেননি। তাই এবার সুযোগ মিললে যাবেন, এবার ভোট দেবেন, যদি কিছু হয়।

হালদা নদীর পাড়ের কুমারখালীতে ছাগল চরাচ্ছিলেন ছগির আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। গত রোববার তোলা
ছবি: প্রথম আলো

হালদা নদীর পাড় ধরে হেঁটে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে কুমারখালী। সেখানে নদীর পাড়ে ছাগল চরাচ্ছিলেন ছগির আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। কথায় কথায় নির্বাচন প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালের পর আর ভোট দিতে পারিনি। তাই এবার ভোট দেব। তিন ছেলে দিনমজুর। যে আয় হয় তাতে সংসার চলে না। নতুন সরকার মানুষের দুঃখ দূর করবে আশা করি।’

চট্টগ্রাম ৫ আসনের অধিকাংশ ভোটার হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা। উপজেলার নিত্য জনদুর্ভোগ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের শেষ নেই। এর মধ্যে যানজট নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব তারা। নির্বাচিত সংসদের কাছে যানজট দূর করার প্রতিশ্রুতি চান ভোটারেরা।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-নগর আংশিক) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৯১৬ জন। মোট প্রার্থী ছয়জন। তাঁরা হলেন বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নাছির উদ্দীন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতি উল্লাহ নূরী, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদ ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. আলা উদ্দিন।

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপি জয়লাভ করে। ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের জোট হলে এর পর থেকে টানা ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম সংসদ সদস্য হন। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া এবার প্রথম এই আসনে নির্বাচন হচ্ছে। বিএনপির প্রার্থী মীর হেলাল ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব নাছির উদ্দিনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে ভোটারেরা জানিয়েছেন। বিএনপি-অধ্যুষিত এই এলাকায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত।

চট্টগ্রাম ৫ আসনের অধিকাংশ ভোটার হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা। উপজেলার নিত্য জনদুর্ভোগ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের শেষ নেই। এর মধ্যে যানজট নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব তারা। নির্বাচিত সংসদের কাছে যানজট দূর করার প্রতিশ্রুতি চান ভোটারেরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. কাওসার হাটহাজারীর আলমপুর থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে আসা যাওয়া করেন ব্যবসার কাজে। বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যানজটে আটকে পড়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শহরের চেয়ে বেশি যানজট হাটহাজারীতে। এখানে ঢুকতে আর বের হতে আধঘণ্টা সময় হাতে রেখে যেতে হয়। ভোট দিয়েও এখানকার লোকজনের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।  

২০০৮ সালের পর আর ভোট দিতে পারিনি। তাই এবার ভোট দেব। তিন ছেলে দিনমজুর। যে আয় হয় তাতে সংসার চলে না। নতুন সরকার মানুষের দুঃখ দূর করবে আশা করি।
ছগির আহমেদ, হালদা পাড়ের বাসিন্দা।

এই আসনের আওতাধীন নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড। কিন্তু ১৮ বছর ধরে এখানকার ৪০ হাজার বাসিন্দা নতুন ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না। এই কারণে এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। গত রোববার রাত নয়টার দিকে দক্ষিণ পাহাড়তলীর শাহজালাল রোডের একটি চা-দোকানে ভোটের কথা তুললে সেখানে থাকা মো. দিদার নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু ১৮ বছর ধরে বাড়ি তুলতে পারছি না। ভোট দিয়ে কী হবে। শেষবারের মতো এবার ভোট দেব। দেখি এবার কী হয়?’

ফতেপুর ইউনিয়নের নেহালপুর গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা সাড়ে ১১টা। গ্রামের বাসিন্দা নুর বেগম শর্ষেখেতে লাগানো শাক তুলছিলেন। সেখানেই আলাপ হলো তাঁর সঙ্গে। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, এবার অবশ্যই ভোট দিতে যাবেন। আগে কয়েকবার গিয়ে ফেরত এসেছেন। তার ভোট অন্যরা দিয়েছিল।

হাটহাজারীতে যানজটের দুর্ভোগ নিত্যদিনের। গত রোববার দুপুরে হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

প্রথম ভোটের অপেক্ষায় তাঁরা

রোববার হাটহাজারীর ফতেপুর, মাদার্শা, সদর, চিকনদণ্ডী চারটি ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডে ঘুরে অন্তত ৪২ জন মানুষের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের মধ্যে তরুণ রয়েছেন ১৮ জন। তাঁরা সবাই এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তাঁদের একজন বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুর রহিম। হাটহাজারী কলেজ গেট এলাকায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। রাতেই অন্য একজন দিয়ে দিয়েছে। তাই এবার অধীর আগ্রহ নিয়ে আছি নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেব বলে।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত ইরা জানান, বিগত নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পরিবেশ ছিল না। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তাই ভোটের দিন পর্যন্ত যাতে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে।