শিশুদের নিয়ে একজন কৃষকের অন্য রকম একুশে ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

শিশুদের হাতে ফুলের ঝুড়ি। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাদের ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনাতে শোনাতে হেঁটে যাচ্ছেন কৃষক মনিরুজ্জামান। চৈতন্যপুর থেকে গ্রামের শিশুদের নিয়ে তিনি যাচ্ছেন কান্তপাশা গ্রামে। তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে যেতে তিনি গল্পে গল্পে বলে যান ইতিহাস। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তিনি এভাবে শিশুদের মুখে মুখে ইতিহাস শেখান।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিভৃত একটি গ্রাম চৈতন্যপুর। শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই, শহীদ মিনারও নেই। পাশের কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছে শহীদ মিনার। কৃষক মনিরুজ্জামানের বাসা রাজশাহী নগরের মহিষবাথান মহল্লায়। তিনি চৈতন্যপুরে জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করেন। তিনি গোদাগাড়ীর এক ফসলি জমিতে নতুন নতুন ফসলের চাষাবাদ করেন। এ জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি জমিতে ফুলের চাষও করেন।

কৃষক মনিরুজ্জামান বরাবরই গ্রামের শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী সব আয়োজন করেন। শনিবার সকাল সাতটা থেকেই শিশুরা তাঁর জমির গাঁদাফুল তুলতে শুরু করে। এবার জমি থেকে তিন ঝুড়ি ফুল তুলেছে শিশুরা। এসব ফুল নিয়ে তাদের তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। যেতেই যেতেই মনিরুজ্জামান তাদের গল্পে গল্পে একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বলেন। তারপর শহীদ মিনারে গিয়ে উপস্থিত অন্যান্য গ্রাম থেকে আসা সব শিশুর হাতে একটি করে গাঁদাফুল দেওয়া হয়। সেই ফুল দিয়ে তারা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। মাঠ থেকে ফুল তোলা, হেঁটে কান্তপাশা বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নেতৃত্ব দেয় চৈতন্যপুর গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার, লক্ষ্মী রানী, নবম শ্রেণির লিপি সরকার, রিত্তিকা রানী, আদুরি রানী, দীপালি রানী ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী উর্মি রানী।

ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে ‘২১’ তৈরি করছে চৈতন্যপুর গ্রামের শিশুরা। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কান্তপাশা গ্রামে কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে
ছবি: প্রথম আলো

মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় শিশুরা ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে বাংলায় ‘২১’ তৈরি করে। বেদির চারদিকে ও সিঁড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর মতো করে ফুল দিয়ে সাজায়। ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় শহীদ মিনারে। মিনারের স্তম্ভের ওপরেও প্রদীপের মতো করে ফুল সাজিয়ে দেওয়া হয়।

কান্তপাশা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম শিশুদের উদ্দেশে বলেন, আজ মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটি কেবল স্মরণীয় দিন নয়, একটি আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ভাষার অধিকারের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের উজ্জ্বল ইতিহাস। সালটি ছিল ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি। এক জনসভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। তার প্রতিবাদেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী মানুষ, যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি...।

কী উদ্দেশ্যে নিজের জমিতে চাষ করা ফুল দিয়ে শিশুদের নিয়ে এই আয়োজন করেন, জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ভাষার কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি সামনে এগিয়ে গেছে। যাদের ভাষা যত জনপ্রিয়, যে ভাষায় যত বেশি মানুষ কথা বলে, সেই ভাষার মানুষ তত বেশি এগিয়ে গেছে। যেমন জাপানে গবেষণা করতে গেলে প্রথম দেড় বছর সেই দেশের ভাষা শিখতে হয়। গবেষণাটি তাদের ভাষাতেই করতে হয়। এর মাধ্যমে আসলে তারা তাদের ভাষাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। আর মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। সেই জায়গা থেকে ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে শিশুদের ভাষাজ্ঞান ও ভাষাশিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি শিশুদের গল্পের ছলে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহান ইতিহাসটা বলেন, যাতে তারা সহজেই এই বয়সে ইতিহাস জানতে পারে। পরে যখন বইপুস্তকে পড়বে, তখন ইতিহাসটা পরিচিত মনে হবে, ভালো লাগবে। ভেতরে শ্রদ্ধাবোধ জাগবে।

অনুভূতি জানতে চাইলে শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার বলে, ‘আমরা নিজের হাতে ফুল তুলেছি। মনির (মনিরুজ্জামান) কাকুর মুখে একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে কখন কান্তপাশায় আইসি পড়ছি, বুঝতেই পারিনি। জীবনে কোনো দিন এই স্মৃতি ভুলব না।’