২৫ দিন পর ধান নিয়ে ফিরেছেন ‘দাওয়াইল্যারা’, ঘরে ঘরে ঈদের আগাম আনন্দ

শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পাওয়া ধান মহাসড়কের পাশে ভাগাভাগি করছেন ‘দাওয়াইল্যারা’। রোববার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডরিয়া সেতুর কাছেছবি: প্রথম আলো

রাত তখন প্রায় একটা। নওগাঁ থেকে ধানভর্তি ট্রাক এসে থামল পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডরিয়া সেতুর কাছে। ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে একে একে বস্তাভর্তি ধান নামান ট্রাকে থাকা শ্রমিকেরা। কারও কারও মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে খুশির ঝিলিক স্পষ্ট। কারণ, প্রায় ২৫ দিন পর বাড়ি ফিরেছেন ধানকাটা শ্রমিকেরা। স্থানীয় ভাষায় যাঁদের বলা হয় ‘দাওয়াইল্যা’।

সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডরিয়া গ্রামের এই দাওয়াইল্যা দলে সদস্য ২০ জন। রোববার সকালে মহাসড়কের পাশে গিয়ে দেখা যায়, বস্তা থেকে ধান ঢেলে এক জায়গায় স্তূপ করছেন শ্রমিকেরা। এরপর সবার হিসাব বুঝে ভাগ করে দেওয়া হবে। কেউ বলছেন কোরবানির কথা, কেউ সংসারের খরচের কথা। আবার কেউ ভাবছেন, এবার হয়তো স্ত্রীর জন্য নতুন শাড়িটাও কেনা যাবে। এবারের মৌসুমে অন্য যেকোনো বারের চেয়ে বেশি ধান পাওয়ায় তাঁদের ঘরে ঘরে এখন উৎসবের আমেজ।

দলের সদস্যরা ২৫ দিন আগে ধান কাটতে গিয়েছিলেন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার আলীপুর গ্রামে। সেখানে কৃষকদের জমির ধান কেটে, মাড়াই করে, শুকিয়ে ও বস্তায় ভরে দেওয়ার কাজ করেছেন। এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছেন ধান।

এবার তাঁরা পেয়েছেন ৫০০ মণের বেশি ধান। ভাগে একেকজনের কপালে জুটছে গড়ে ২৫ মণের বেশি। অন্য বছরগুলোতে প্রতি মণ ধানের বিপরীতে পারিশ্রমিক হিসেবে ছয়–সাত কেজি ধান মিললেও এবার শ্রমিকসংকটের কারণে তাঁরা পেয়েছেন ১০ কেজি করে।

ধান ভাগাভাগির সময় শ্রমিক সবুজ মিয়া বলেন, ‘এবার যে পরিমাণ ধান পাইছি, এমন আগে খুব কম পাইছি। কোরবানির আগে বাড়ি ফিরতে পারছি, এটাই সবচেয়ে বড় খুশি। কিছু ধান বিক্রি করব, কিছু ঘরে রাখব। এবার ঈদটা মনে হয় ভালোভাবেই যাবি।’

শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পাওয়া ধান মহাসড়কের পাশে ভাগাভাগি করছেন ‘দাওয়াইল্যারা’। রোববার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডরিয়া সেতুর কাছে
ছবি: প্রথম আলো

এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফরিদ সরদার। তাঁর মুখেও তৃপ্তির হাসি। তিনি বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার আয় ভালো হইছে। বাচ্চারা ঈদের জামার কথা কইতেছে। ঘরের মানুষও ম্যালা খুশি। এই ধান না থাকলি ঈদের আগে এত খরচ সামলানো কঠিন হইত।’

কথা বলে জানা যায়, ধানকাটা মৌসুম এলেই সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে দল বেঁধে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যান দাওয়াইল্যারা। শুধু এ দুই উপজেলা থেকেই এমন অর্ধশতাধিক দল প্রতি মৌসুমে নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটতে যায়।

প্রতিটি দলে একজন সর্দার, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন বাবুর্চি থাকেন। এই দলের সর্দার আবদুল খালেক। তিনি বলেন, ‘আগের বছর যেসব গৃহস্থের জমিতে ধান কাটছি, তাঁদের সঙ্গে মোবাইলেই যোগাযোগ হয়। এবার শ্রমিকের খুব অভাব ছিল। তাই আমরা প্রতিমণে ১০ কেজি ধান পাইছি। ধান কাটার পাশাপাশি মাড়াই, শুকানো, ঝাড়াই কইর‍্যা বস্তায় ভইর‍্যা দিছি।’

দলের হিসাবরক্ষক আবদুদ দাইন, যাঁকে সবাই ‘মুহুরি’ নামে ডাকেন, তিনি খাতা খুলে হিসাব দেখান। তিনি বলেন, ‘যাওয়ার আগে সবাই চার হাজার টাকা কইর‍্যা জমা দিছিল। মোট ৮০ হাজার টাকা আছিল। পরে যাওয়া-আসা, রান্নাবান্না আর ধান আনার ট্রাকভাড়া মিলায়া মোট ৯৫ হাজার টাকা খরচ হইছে।’

আবদুদ দাইন আরও বলেন, ‘এই ধান কেউ সারা বছরের খাওয়ার জন্য রাখবে, কেউ বিক্রি কইর‍্যা সংসারের খরচ চালাবে। কোরবানির আগে হাতে ধান আইস্যা পড়ায় সবাই অনেক খুশি।’

দলের বাবুর্চি নায়েব আলী ধান কাটেন না। তাঁর কাজ তিন বেলা সবার রান্না করা। তিনি বলেন, ‘২০ জন মানুষের রান্না করা সহজ না। কিন্তু সবাই একসঙ্গে থাকি বইল্যা কষ্ট মনে হয় না। এবার আয় ভালো হওয়ায় সবার মনও ভালো। আমিও সবার সমান ধান পাব।’

শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পাওয়া ধান মহাসড়কের পাশে ভাগাভাগি করছেন ‘দাওয়াইল্যারা’। রোববার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডরিয়া সেতুর কাছে
ছবি: প্রথম আলো

শ্রমিকেরা জানান, গৃহস্থরা তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করলেও খাওয়া, যাতায়াত ও ধান আনার সব খরচ নিজেদের বহন করতে হয়। তবু স্থানীয়ভাবে দিনমজুরির কাজ করার চেয়ে দাওয়াইল্যা হয়ে দূরের জেলায় গিয়ে ধানকাটায় লাভ বেশি।

পুন্ডরিয়া গ্রামের কয়েকজন শিশু-কিশোরকে মহাসড়কের পাশে ধানের স্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা ধান নিয়ে ফিরে আসা শ্রমিকদের কারও না কারও সন্তান। তাদের চোখেমুখেও খুশির ঝিলিক। তাদের মধ্যে কিশোর আশিক হোসেন বলে, ‘আব্বা কইছে ধান নিয়্যা আইস্যা আমাকে ফুটবল কিন্যা দিবি। এ জন্য এখনই আমাগরে ঈদের আনন্দ শুরু হয়া গেছে।’

সাঁথিয়া ও বেড়ার গ্রামগুলোতে এখন এমন দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। কোথাও ট্রাকভর্তি ধান নামছে, কোথাও চলছে ভাগাভাগি। দাওয়াইল্যাদের ঘরে ঘরে তাই এখন কোরবানির ঈদ ঘিরে দেখা দিয়েছে বাড়তি আনন্দ।