২২ দিনের লড়াই শেষে একমাত্র সন্তানের লাশ নিয়ে ফিরলেন মা–বাবা
দেড় বছর আগে বিয়ে হয় জান্নাতুল ফেরদৌসের (২০)। স্বামী আবদুল্লাহ মো. রাসেল চট্টগ্রাম নগরের একটি নাশতার দোকানের কারিগর। সীমিত আয় দিয়ে সুখেই দিন কাটছিল রাসেল-সাদিয়া দম্পতির।
চার মাস আগে তাঁদের ঘরে জম্ম নেয় এক ছেলেশিশু। ঘরজুড়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বাবার সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ আল সাফওয়ান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসতে শেখে সাফওয়ান। তার হাসির মূহূর্তগুলো নিজের স্মার্টফোনে ভিডিও করে রাখতেন জান্নাতুল ফেরদৌস।
সেই ভিডিওগুলোতেই আদরের ছেলেকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন জান্নাতুল ফেরদৌস। এসব ভিডিও এখন শুধুই স্মৃতি। স্মার্টফোনে সাফওয়ানের ভিডিও অ্যালবাম আর বড় হবে না। হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ দিনের লড়াই শেষে গত বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয় সাফওয়ানের। জান্নাতুল ফেরদৌসের শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নের তালুকদারপাড়া এলাকায়।
আমার বাবুর হাসিমাখা মুখ কখনো ভুলতে পারব না। আমার সব অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল সে। তার ভিডিও করে রাখতাম বড় হলে তাকে দেখাব বলে। কিন্তু আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল
সাতকানিয়ার কেরানীহাট স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে মৌলভীর দোকান এলাকা। সেখান থেকে মইষামুড়া–খোদারহাট সড়ক হয়ে আরও আট কিলোমিটার পশ্চিমে আমিলাইষ সরোয়ার বাজার। সেখান থেকে সরু গ্রামীণ সড়ক ধরে আরও দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই সাঙ্গু নদের তীরে তালুকদারপাড়া এলাকায় টিন দিয়ে ঘেরা জান্নাতুল ফেরদৌসের ছোট বসতঘরটি।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের বারান্দায় বসে জান্নাতুল ফেরদৌস স্মার্টফোনে ছেলের ছবি-ভিডিও দেখছেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে যেন কান্না করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। পাশাপাশি একই কক্ষে বসে আছেন তাঁর স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ি।
জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বাবুর হাসিমাখা মুখ কখনো ভুলতে পারব না। আমার সব অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল সে। তার ভিডিও করে রাখতাম বড় হলে তাকে দেখাব বলে। কিন্তু আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২২ দিন আগে জ্বর ও কাশি শুরু হয় শিশু সাফওয়ানের। মা তাকে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চার দিন পরও কোনো উন্নতি হয়নি। তারপর গত ১৯ এপ্রিল বিকেলে তাকে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় তার সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। চিকিৎসক জানান, এসব হামের লক্ষণ। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। দরিদ্র পরিবারটির সেই খরচ বহন করার সক্ষমতা ছিল না।
ওই দিন রাতেই সাফওয়ানকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরের দিন স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সন্তানকে উপজেলার আগের বেসরকারি হাসপাতালটিতে নিয়ে যান জান্নাতুল ফেরদৌস। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২৯ এপ্রিল থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩৩ জন ভর্তি ছিল। যার মধ্যে ২৩০ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ৮৮, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৮৫৫ জন।
২১ এপ্রিল রাত আড়াইটার দিকে শিশু সাফওয়ানকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান জান্নাতুল ফেরদৌস। অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন পর তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে স্বামী রাসেলকে নিয়ে সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই শুরু করেন। একদিকে সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি, অন্যদিকে হাতে কানাকড়িও নেই। ছেলের খেয়াল রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ জোগাতে অনেকের কাছে ধার ও সাহায্য চান জান্নাতুল ফেরদৌস। সহযোগিতা চেয়ে পরিচিতজনদের দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করান। চট্টগ্রাম মেডিকেলের একজন চিকিৎসক তাঁকে তিন হাজার টাকা দেন, ফেসবুকে দেওয়া বিকাশ নম্বরে অন্য একজন দেন দুই হাজার টাকা। ধার করেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা।
সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৪ মাস ১০ দিন বয়সী সাফওয়ান। ওই দিনই এশার নামাজের পর জানাজা শেষে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২৯ এপ্রিল থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩৩ জন ভর্তি ছিল। যার মধ্যে ২৩০ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ৮৮, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৮৫৫ জন।