নদী ও ভ্রমণ পছন্দ করতেন তানভীর, চলেও গেলেন ঘুরতে গিয়ে নদে ডুবে
‘সাঝের বেলা হইতে জানালাটা কাঁপতেছে, বাইরে ফোটাখানিও বাতাস নাই, কে যেন আইতেছে, কে যেন আইতেছে।’ এই কবিতার নাম ‘মরণ’। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বের করা ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সাইরেন’–এর তৃতীয় বর্ষের অষ্টম সংখ্যায়।
তানভীর আহমেদের কবিতা লেখা ছিল নেশা। আর পছন্দ করতেন নদী ও ভ্রমণ। কে জানত এভাবে এক ভ্রমণে গিয়েই নদে ডুবে চিরতরে হারিয়ে যাবেন তিনি।
তানভীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে নদী ও ভ্রমণবিষয়ক বিভিন্ন পোস্ট চোখে পড়ে। সবচেয়ে বেশি পোস্ট দিয়েছেন নিজের লেখা কবিতা। বোঝা যায়, নদী, ভ্রমণ আর কবিতার নেশা তাঁর রক্তে ছিল।
গত সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনীপাড়া এলাকায় গড়াই নদে রেলসেতুর নিচে নামেন তানভীরসহ তিনজন। তাঁদের দুজন সাঁতরে গড়াই নদ পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় একজন তীরে উঠতে পারলেও তানভীর (২৩) পানির স্রোতে তলিয়ে যান। এর ৪৩ ঘণ্টা পর আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় গড়াই নদ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
নদের পাশে বসে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন তানভীরের বাবা আবদুল মালেক। এ সময় বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যান তিনি। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কাঁদতে থাকেন স্বজনেরাও।
এর আগে সকাল আটটায় তৃতীয় দিনের মতো তানভীরকে উদ্ধার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। নদের পাড়ে বসে অপেক্ষায় থাকেন তাঁর বাবা, ভাই, মামাসহ বন্ধুরা।
নদের পাড়ের বসে পানির দিকে মলিন চোখে তাকিয়ে ছিলেন তানভীরের বন্ধু আশিকুর রহমান। বন্ধুর নানা স্মৃতিচারণা করে একপর্যায়ে গলা ধরে আসে তাঁর, ‘সবই ঠিক ছিল। হঠাৎ কী হতে কী হয়ে গেল...! কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।’
চোখ মুছে আশিকুর রহমান বলেন, তাঁরা ঢাকা থেকে ১৩ জন বন্ধু মিলে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। খুলনা হয়ে প্রথমে মেহেরপুরের মুজিবনগর, এরপর সোমবার সকালে কুষ্টিয়ায় পৌঁছান। ওই দিন দুপুরে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ঘুরে বিকেলে কুষ্টিয়া শহরসংলগ্ন লালন শাহর আখড়াবাড়িতে যাচ্ছিলেন। এর আগেই রেলসেতু ও পাশে একটা সড়কসেতু দেখে তাঁরা নেমে পড়েন। গড়াই নদের বেশির ভাগ অংশজুড়ে চর—যা দেখে মুগ্ধ হন তাঁরা। চরে নেমে হাঁটাহাঁটি করেন কয়েকজন। এর মধ্যে কিছু অংশে পানি দেখে তাতে নেমে পড়েন ইয়াসির আরাফাত ও তানভীর আহমেদ। নদের বেশির ভাগ জুড়েই ছিল হাঁটুপানি। হঠাৎ রেলসেতু দিয়ে ট্রেন যেতে থাকে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে দুজন পানিতে নেমে হাঁটতে থাকেন।
দুই বন্ধুর ঠিক পেছনে ছিলেন আশিকুর রহমান। তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইয়াসির ও তানভীর পানিতে একটি গর্তের ঘূর্ণিস্রোতে পড়ে যায়। পেছন থেকে দুজনের দুই হাত ধরি আমি। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ইয়াসির হাত ছেড়ে দিয়ে সাঁতরে কোনো রকম তীরে ওঠে। এরপর তানভীর বলে, “পায়ের নিচ থেকে বালি সরে যাচ্ছে, আমাকে টান দাও।” কয়েক মুহূর্ত ধরে রাখার একপর্যায়ে আর হাত ধরে রাখতে পারিনি। দেড় মিনিট ধরে ছিলাম। আর পারলাম না। এই যে তলিয়ে গেল চোখের সামনে, আর উঠল না।’
নদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ডুকরে কেঁদে ওঠেন আশিকুর। তানভীর সাঁতার জানতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন একটু পরেই লালন শাহর আখড়াবাড়ি দেখে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। অথচ কী হয়ে গেল।’
পাড়ে পায়চারি করছিলেন আর মুঠোফোনে স্বজনদের কল ধরে খবরটা দিচ্ছিলেন তানভীরের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম। শোকের ছাপ চোখেমুখে। তিনি বলেন, তানভীরের বাবা আবদুল মালেক বরগুনা সরকারি কলেজের শিক্ষক। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তানভীর ছিল মেজ। বড় মেয়ে ও জামাতা দুজনই চিকিৎসক। ছোট ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে।
নিখোঁজের পর থেকেই তানভীর আহমেদকে উদ্ধারে দুই দিন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও ছিল তৎপর। বুধবার সকাল থেকে সেখানে ছিলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দবির উদ্দীন।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গড়াই নদের যে অংশে তানভীর ডুবে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে স্রোতের দিকে ৫০০ মিটার দূরে তাঁর লাশ পাওয়া গেছে। কোনো অভিযোগ না থাকায় পরিবারের কাছ লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বজনেরা লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে বরগুনায় নিয়ে গেছেন।