স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সই অযৌক্তিক: বদিউল আলম

ময়মনসিংহে সুজন আয়োজিত বিভাগীয় সংলাপ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির বদিউল আলম মজুমদার। আজ দুপুরে নগরের একটি রেস্টুরেন্টেছবি: প্রথম আলো

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, যাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তাঁদের প্রার্থিতা অকারণ বাতিল করা হলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যাঁদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাঁদের একটি বিরাট অংশ স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।

‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এক সংলাপে এ কথাগুলো বলেন সুজন সম্পাদক। আজ সোমবার সকালে ময়মনসিংহ নগরের নতুন বাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে এ সংলাপের আয়োজন করে সুজনের ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর শাখা। এতে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের সুজন প্রতিনিধি ও নাগরিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে বলেছিলাম, শুধু ৫০০ ব্যক্তির স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা যেন সৃষ্টি হয় এবং এসব স্বাক্ষর যেন হলফনামার মাধ্যমে দেওয়া যায়। তাহলে এখন যেভাবে ১০ জনকে ডেকে আনা হয়, কারও কারও ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে স্বাক্ষরকারীদের চাপ প্রয়োগ করার। এর মাধ্যমে একটি জালিয়াতির সুযোগ থেকে যায়। আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম, সেটি আরপিওতে সংযুক্ত হলে এ ধরনের কারসাজির আর সুযোগ ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশন এটি আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করেনি।’

এবারের নির্বাচন ও প্রশাসনের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন দলের অভিযোগের বিষয়ে সুজন সম্পাদক বলেন, যেহেতু এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন নির্বাচন হচ্ছে, আশা করা যাচ্ছে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা পালনের বিষয়টি সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে।

নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণ দরকার জানিয়ে বদিউল আলম বলেন, এ সময় কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার দরকার—আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করবে এবং প্রতিবারই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কিন্তু শুরু হতে হবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। এ জন্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ—সবাইকেই ভূমিকা রাখতে হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উপযুক্ত কি না, এমন প্রশ্নে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘ব্যাপক দলীয়করণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকে পালিয়ে গেছেন। কর্মকর্তা থেকে সাধারণ সিপাহি পালিয়েছেন। ভেঙে পড়া একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দলনিরপেক্ষ সরকার নিশ্চিত করবে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে।’

বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়। এতে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের ১০ জন প্রার্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ, জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রার্থী কামরুল আহসান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোস্তাক আহাম্মদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির লিয়াকত আলী ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী এমদাদুল হক।

‘মেকানিজমের মাধ্যমে কেউ সরকারে গেলে কীভাবে পতন ঘটাতে হয়, তা জানা আছে’

সংলাপে অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান, ময়মনসিংহ শহরের যানজট নিরসন, সংস্কৃতির বিকাশ, ঘুষ-দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ, নগরে সড়ক বৃদ্ধি, খেলার মাঠ বাড়ানো, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নারীবান্ধব পরিবেশ, কৃষি খাতে সিন্ডিকেট ভাঙাসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া গণভোট নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থানের কথাও জানান। এসব নিয়ে সংলাপে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে সমাধানের আশ্বাস এবং নির্বাচনী ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

জামায়াতের প্রার্থী কামরুল আহসান বলেন, ‘রাজনীতি নষ্ট হয়েছে আমলাতন্ত্রের কারণে। আমি নিজে দুর্নীতি করব না এবং যারা দুর্নীতি করে, সেই প্রশাসনকেও প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের দ্বিচারী আচরণ দেখতে যাচ্ছি। কোনো মেকানিজমের মাধ্যমে যদি কেউ সরকারে যায়, তাহলে কীভাবে পতন ঘটাতে হয়, তা আমাদের জানা আছে। আমি নির্বাচিত হলে রাস্তাঘাট বাড়াব, কৃষির সিন্ডিকেট ভাঙব, যানজট নিরসনে কাজ করা হবে, সংস্কৃতির বিকাশে হস্তক্ষেপ করা হবে না।’

বিএনপির দলীয় প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, সদর আসনটি নানাভাবে অবহেলিত। গত ১৭ বছরে এখানে কোনো উন্নয়ন হয়নি। নির্বাচিত হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে, নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ–ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা সুজনের সভাপতি মিজানুর রহমান। সুজনের জেলা শাখার সম্পাদক ইয়াজদানী কোরাইশীর ও মহানগর সুজনের সম্পাদক আলী ইউসুফের সঞ্চালনায় ও মহানগর সুজনের সভাপতি শিব্বির আহমেদ লিটনের সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।