চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে স্বজনেরা যখন মরদেহ বুঝে নিচ্ছিলেন, তখন পটিয়ার খানমোহনা এলাকার বাড়িতে মাতম। স্বামী হারানোর খবর শুনে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন কামরুন নাহার। কখনো স্বজনেরা তাঁকে পানি খাওয়াচ্ছেন, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই থামছে না তাঁর কান্না। পরিবারের সদস্যদের কেউ তাঁকে একা রাখতে সাহস পাচ্ছেন না।
কামরুন নাহারের স্বামী মোহাম্মদ ইউসুফ (৫৩) কর্ণফুলীর শিকলবাহা এলাকায় বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত চারজনের একজন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পটিয়াগামী একটি চার চাকার লেগুনার সঙ্গে কক্সবাজার থেকে আসা চট্টগ্রামমুখী ঈগল পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে লেগুনার বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা শুরুতে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে মৃত্যু হয় আরও একজনের। আহত আরও কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নিহত ইউসুফের বড় ছেলে মোহাম্মদ মুসার সঙ্গে (৩২) কথা হয় আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। রক্তচাপ বেড়ে গেছে। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। পরিবারের সবাই তাঁকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খানমোহনা গ্রামে মুসাদের বাড়ি। মুসা জানান, গতকাল তাঁর বাবা পটিয়ার কোলাগাঁও এলাকায় বোনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে যান মইজ্জারটেক গিয়ে একটি লেগুনায় ওঠেন। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি লাইভ ভিডিও দেখে তিনি বাবাকে শনাক্ত করেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, আহত ও নিহত সবাইকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে বাবার মরদেহ শনাক্ত করেন।
মুসা বলেন, ‘দুর্ঘটনার ভিডিওটি দেখার পর বুক কেঁপে উঠেছিল। তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আব্বু আর নেই। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। এত যন্ত্রণা কেউ সইতে পারছি না।’
আজ সকাল ৯টার দিকে পরিবারের সদস্যরা ইউসুফের মরদেহ বুঝে পান। জুমার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই ছেলের বাবা ইউসুফ পেশায় গ্রিলশ্রমিক ছিলেন। বড় ছেলে মুসাও একই পেশায় কাজ করেন। তাঁদের কোনো স্থায়ী দোকান ছিল না। যেখানে কাজের ডাক আসত, সেখানেই গিয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন। বাবা-ছেলের আয় মিলিয়ে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো হতো। সেই আয়েই চলত পুরো পরিবার।
মুসা বলেন, ‘আমি আর আব্বু একসঙ্গে কাজ করতাম। সংসারের বড় ভরসা ছিলেন তিনি। ছোট ভাই এখনো কাজ শেখার পর্যায়ে। এখন পরিবারের দায়িত্ব কীভাবে সামলাব, বুঝতে পারছি না।’
বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও দুর্ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন মুসা। তিনি বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। পুলিশ আমাদের কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য নিয়েছে। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
গতকাল দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও আছেন কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের খুরাইশ চৌধুরীবাড়ির নূর হোসেনের ছেলে সজীব হোসেন (২৬), উপজেলার আশিয়া ইউনিয়ন মোল্লাপাড়া খন্দকারবাড়ির মবিনুল ইসলামের ছেলে এমদাদুল ইসলাম ওরফে রুবেল (২৬) ও পটিয়া পৌরসভার গোবিন্দখিল এলাকার অলি মিস্ত্রিবাড়ির বাদশা মিয়ার ছেলে হারুনর রশিদ (৫১)।
রুবেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁর বোন ও মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রুবেলের বোন মাতম করতে করতে বলছেন, ‘ও আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম।’