এক হাজার কোটি খরচে সিলেটে জলাবদ্ধতার সমাধান হয়নি, এবার সাড়ে ৪ হাজার কোটির প্রকল্প
সিলেট নগরের গাভিয়ার খাল দিয়ে আশির দশকেও নৌকা চলাচল করত। ওই সময় নবাব রোড এলাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কার্যালয় নির্মাণ করতে গিয়ে খালের একটি অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করে কার্যালয়ের বেষ্টনীর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খাল ভরাটের নজিরের পর আশপাশের বাসিন্দারাও যেন উৎসাহিত হন। অনেকে তখন পাড় ও খাল দখল করে নিজেদের জায়গার বিস্তৃতি বাড়ান। ধীরে ধীরে ১২ থেকে ১৫ মিটার প্রস্থের খাল এখন সাড়ে ৫ মিটারে দাঁড়িয়েছে। খালের গভীরতাও প্রায় ১০ মিটার থেকে এখন গড়ে ৪ মিটারে নেমেছে।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৩ সালে এসে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গাভিয়ার খাল খনন করতে দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালায় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এ সময় পাড়ের অনেক অবৈধ স্থাপনা সরানো হলেও বেশ কিছু অক্ষত রয়ে যায়। এমনকি এলজিইডি কার্যালয়ের বদলে ফেলা খালের গতিপথও পুরোনো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। যথাযথভাবে হয়নি খননও। ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান আসেনি।
সিলেট নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে ছোট-বড় ৩৯টি ছড়া ও খাল প্রবাহিত হচ্ছে। এসব গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। ফলে বৃষ্টির পানি এসব দিয়েই নদীতে গড়ায়। তবে গাভিয়ার খালের মতো অন্যগুলোও যথাযথভাবে খনন না হওয়ায় এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করায় জলাবদ্ধতা সমস্যার কার্যকর সমাধান আসেনি। অথচ নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিটি করপোরেশন। সম্প্রতি আবার সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নগরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত ছড়া ও খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে নগরে নালা-নর্দমা আছে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে পাকা ড্রেন আছে অন্তত ১ হাজার কিলোমিটার অংশে। গত ১৬ বছরে প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমেছে।
তবে নগরের বাসিন্দা পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, হাজার কোটি টাকা খরচ করেও নগরের জলাবদ্ধতা দূর হয়নি। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই এমনটি হয়েছে। যে কারণে এখনো সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরের ছড়ারপার, যতরপুর, উপশহর, মাছিমপুর, সবুজবাগ, ঘাসিটুলাসহ অর্ধশতাধিক এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। হালকা ও মাঝারি জলাবদ্ধতা তৈরি হয় আরও কিছু এলাকায়।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতের কাজ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে এখন থেকে যা হবে, সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে করা হবে। নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২ মে সিলেটে এসে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এটা বাস্তবায়িত হলে নগরের জলাবদ্ধতার সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর হবে।’
বর্ষাকাল শুরুর পর সবশেষ গত বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে সিলেট নগরের অন্তত ১৫টি স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর আগে গত বছরের ২০ ও ৩১ মে টানা বৃষ্টিতে দুই দফায় নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরপানি দেখা দেয়। এসব এলাকার অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানে তখন পানি ঢোকে। এর আগে ২০২২ সালের ১৭ জুলাই, ১২ ও ১৩ মে এবং ২০২৪ সালের জুন মাসে কয়েক দফা বৃষ্টির পানিতে নগরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল।
১৬ বছরে হাজার কোটি টাকা খরচ
সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে ছড়া-খাল খনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বদরউদ্দিন আহমদ কামরান মেয়র থাকাকালে ২০০৯ সালে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকটি ছড়া খনন করা হয় এবং ৫ কিলোমিটার রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়। পরে বিএনপিদলীয় আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৩৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর অধীনে ছড়া দখলমুক্ত করে খনন করা হয়। পাশাপাশি ৩৯ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার রিটেনিং ওয়াল, ইউটাইপ ড্রেন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়।
আরিফুল হক চৌধুরীর সময়ে দুটি ছড়ার কিছু অংশে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে করা হয়েছে বক্স কালভার্ট। ২০২৪ সালে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাগরদিঘির পাড় এলাকার ছড়া খনন ও সংস্কারকাজ শুরু হয়ে সম্প্রতি শেষ হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র থাকাকালে কয়েক ধাপে প্রায় ৬১ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়। এখনো কোথাও কোথাও এসব কাজ চলছে।
একই সূত্র বলছে, ছড়া খনন–সংস্কারের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিটি কর্তৃপক্ষ নগরের নালা-নর্দমা প্রশস্ত করা ও নির্মাণের কাজও করছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ খাতে কাজ হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার। এ ছাড়া ২০২৪ সাল থেকে আরও প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়। যার কিছু কাজ এখনো চলমান।
বেদখল ছড়া, উৎসমুখে আবর্জনা
নগরে প্রবাহিত ছড়াগুলো যথাযথ খননের অভাবে পানির ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দুই পাশ থেকে দখল ও ময়লা–আবর্জনা ফেলার কারণে পানিপ্রবাহের পথও সংকুচিত হয়ে গেছে।
১৩ মে বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, মঙ্গলীছড়ার যে অংশটি পূর্ব কাজিরবাজার এলাকা দিয়ে সুরমা নদীর সঙ্গে মিশেছে, এর লাগোয়া সেতুর পাশেই ছড়ার অনেকটা অংশ দখল করে একটি বাঁশ-টিনশেডের ঘর তৈরি করা হয়েছে। তবে ছড়া দখল করে তৈরি করা ‘হাসান টি স্টল’ নামের ওই ঘরটি সেদিন তালাবদ্ধ ছিল।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে পূর্ব কাজিরবাজার এলাকায় ছড়ার উৎসমুখে গার্ডওয়াল তৈরি করা হয়। তবে আশপাশে ছড়ার অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে গার্ডওয়াল তৈরি করায় মূল ছড়া আগের চেয়ে সরু হয়ে পড়ে। এমনকি ছড়ার খননকাজও গভীর করে করা হয়নি। এতে বৃষ্টি হলেই পানি উপচে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হয়। নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ করায় ছড়ার উৎসমুখ এবং আশপাশে সব সময় বর্জ্য ভেসে থাকে। এতে প্রায় সময় পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ থাকে।
একই দিন বিকেল পাঁচটার দিকে মাছিমপুর ও ছড়ারপাড় এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে প্রবাহিত গোয়ালি ছড়ার উৎসমুখে গিয়ে দেখা গেছে, ছড়ায় ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। চার থেকে পাঁচ বছর আগে এ ছড়ার বিভিন্ন অংশ দখলমুক্ত করে গার্ডওয়াল স্থাপন করা হলেও ছড়ার পশ্চিম অংশের উৎসমুখে অন্তত আধা কিলোমিটার অংশে মানুষজনের অবৈধ দখলে থাকা ছড়ার জায়গা দখলমুক্ত করে কোনো গার্ডওয়াল তৈরি করা হয়নি। অথচ এসব স্থানে গার্ডওয়াল তৈরি করার কথা ছিল। এমনকি পশ্চিম দিকে ছড়ার উৎসের প্রথম আধা কিলোমিটারে কোনো খননকাজ না হওয়ায় ডান পাশে ছোট টিলা আকৃতির মাটির স্তূপ জমে আছে।
গাভিয়ার খালের তীরবর্তী নবাব রোড, শামীমাবাদ এলাকার তিনজন বাসিন্দা জানান, এলজিইডি কার্যালয় নির্মাণের সময় গাভিয়ার খালের গতিপথ পরিবর্তন করার কারণে ওই খালটি নিজস্বতা হারিয়েছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে খালের তলদেশে পলিথিন আর বর্জ্য স্তূপাকারে জমে আছে। খনন করে এসব অপসারণ করাও জরুরি।
এদিকে পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, গত ১৬ বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘অপরিকল্পিত কাজের’ পাশাপাশি কিছু কার্যকর কাজও হয়েছে। বিশেষ করে আরিফুল হক চৌধুরীর সময়ে ছড়া দখলমুক্ত আর খননের কাজ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। তবে ছড়া দখল করে স্থাপনা তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিপুলসংখ্যক অবৈধ দখলকারী এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।
নির্মাণত্রুটি, অপরিকল্পিত উন্নয়ন
নগরবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন প্রকল্পের পর প্রকল্প নিলেও তা পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। কোথাও ছড়ার উপরিভাগ ঢেকে ‘বক্স কালভার্ট’ নির্মাণ করে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের গতি রুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। যথাযথ খনন না করেই কোথাও রিটেনিং ওয়াল করা হয়েছে। অনেক এলাকায় ছড়ার দখলদারদেরও উচ্ছেদ করা হয়নি। এ কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমেনি।
দুজন নগরবিদ বলছেন, নগরের বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, বারুতখানা, জেল রোডসহ বেশ কিছু এলাকায় গত কয়েক বছরে যেসব ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, সেসব সিমেন্ট দিয়ে আটকে ‘পার্কিং টাইলস’ বসানো হয়েছে। এ নির্মাণত্রুটির কারণে ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নতুন (গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পান) সিটি প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর নির্দেশনায় সম্প্রতি অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এসব ড্রেনের অংশবিশেষ ভেঙে বর্জ্য অপসারণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, পশ্চিম দরগা মহল্লা এলাকা থেকে পুরোনো মেডিক্যাল রোডের আয়েশা কেয়ার ক্লিনিক পর্যন্ত ছড়ার উপরিভাগ ঢেকে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা রয়েছে। এ কারণে বেশি বৃষ্টি হলে ওই ছড়া দিয়ে পানি যথাযথভাবে প্রবাহিত হতে পারে না বলে পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করেছেন। এমনকি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করায় ছড়ার ময়লা-আবর্জনাও অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন করে নগরে আর কোনো ছড়ায় বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।
এ ছাড়া ছড়ার কোন কোন জায়গায় পানি আটকাচ্ছে, কোথায় পানি বের হওয়ার পথ নেই—জরিপ করে এসব স্থান চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে খনন করার কোনো উদ্যোগ জলাবদ্ধতা নিরসনে শেষ হওয়া প্রকল্পগুলোতে ছিল না। একই সঙ্গে শহরের মধ্যে প্রবাহিত সুরমা নদীর তলদেশে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্যে কয়েক ফুট ভরাট হলেও তা খননের ব্যবস্থা না নেওয়াও জলাবদ্ধতার প্রধান কয়েকটা কারণের একটি বলে পরিবেশবাদী সংগঠকেরা বলছেন।
অপরিকল্পিত কাজের বিষয়টি অস্বীকার করে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলী আকবর প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকমতো কাজ হওয়ায় নগরে আগের চেয়ে জলাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়েছে। সুরমা নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা ছাড়া শহরের অন্যান্য জায়গায় এখন জলাবদ্ধতা নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ায় কিছু জায়গায় পানি জমে। তা দ্রুত নেমেও যায়। তবে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে পারলে জলজট আরও কমানো যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা প্রথম আলোকে বলেন, সিলেটে পুকুর, দিঘিসহ জলাভূমিগুলো ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। উন্নয়নের নামে ড্রেন-খালগুলো সরু করে ফেলা হয়েছে। নগরবাসীর অসচেতনতায় ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে উঠেছে। সেসব নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মূলত অপরিকল্পিত কাজের কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি।
যা আছে নতুন প্রকল্পে
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা জানিয়েছে, নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২ মে সিলেটে একটি বিশেষ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর আগে কখনো এত বড় প্রকল্প নেওয়া হয়নি। শাহপরান সেতু থেকে তেমুখী সেতু পর্যন্ত সুরমা নদীর দুই পারের ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এ প্রকল্প এলাকা বিস্তৃত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে প্রকল্পের বরাদ্দ এখনো আসেনি।
সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষা করে প্রকল্পের নকশা তৈরি করেছেন। এর আওতায় সুরমা নদীর দুই পাড় ১৩ কিলোমিটার অংশে করে উঁচু বাঁধ করা হবে। সর্বশেষ ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যার সময়ে পানি যে মাত্রায় প্রবাহিত হয়েছিল, এর চেয়েও অনেক উঁচু করে বাঁধ হবে। পাশাপাশি নদীতীরে সৌন্দর্যবর্ধন, গাছ রোপণ এবং ফুডকোর্ট নির্মাণসহ নগরবাসীর বেড়ানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হবে। প্রকল্প এলাকায় যদি মালিকানাধীন জায়গা থাকে, তাহলে সেটা অধিগ্রহণ করা না গেলে সেখানে ফ্লাড ওয়াল তৈরি হবে।
প্রকল্পের আওতায় সুবিধামতো পানি যাওয়া-আসা নিয়ন্ত্রণ করতে গোয়ালি ছড়া, বৈঠা খাল ও হলদি ছড়ায় তিনটি ‘রেগুলেটর গেট’ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ওই স্থানে ভারী বৃষ্টির পানি সেচে সুরমা নদীতে ফেলতে তিনটি পাম্প স্টেশনও বসানো হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, সুরমা নদীর সঙ্গে যুক্ত নালা, খালের যেসব অংশে ওভারফ্লো হয়, এ রকম ৫০টি স্থানে ‘ফ্ল্যাপ গেট’ (জল ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত বিশেষ দরজা) নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সুরমা নদীর দুই পারে নতুন করে কিছু খাল-নালা কিংবা ডিসকানেকটিং হয়ে পড়া খাল খনন করে পানি চলাচলের পথ তৈরি করা হবে। এ ছাড়া চা-বাগান ও টিলা থেকে প্রবাহিত কিছু ছড়া দিয়ে বৃষ্টির মৌসুমে মাটি ক্ষয় হয়ে ছড়া-খাল ভরাট হচ্ছে। উজানে এ মাটি ক্ষয়ের প্রভাব ঠেকাতে পাঁচটি জায়গায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের জলাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় শহরের জলাবদ্ধতা দূরের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনও করা হবে। নদীর পানি যেন উপচে শহরে ঢুকতে না পারে, সেটাও এ প্রকল্পের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হবে।
‘আবার যেন আগের ভুল না হয়’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রচুর টাকা ব্যয়ে হলেও পরিকল্পনামাফিক কাজ না হওয়ায় সমস্যা রয়েই গেছে। আগের প্রকল্পগুলোতে বক্স কালভার্ট তৈরি করাটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। একটা প্রাকৃতিক ছড়াকে কখনোই বক্স কালভার্ট দিয়ে আবদ্ধ করে ফেলাটা ঠিক হয়নি। ড্রেনগুলো পুরোপুরিভাবে ঢেকে ফেলাটাও উচিত হয়নি। কংক্রিটের স্থায়ী কিছু একটা করে ফেললে পরে তা তুলে বর্জ্য অপসারণ করা অনেক কঠিন বিষয়। এসব ছোটখাটো বিষয়ই পরে বড় সমস্যা তৈরি করে। এ ছাড়া সুরমা নদীর তলদেশে জমা হওয়া প্লাস্টিক, পলিথিনসহ বর্জ্য খনন করে অপসারণ করাও উচিত।
অধ্যাপক মুশতাক আহমদ আরও বলেন, ‘এখন যে নতুন প্রকল্প ফের নেওয়া হলো, আবার যেন সে কাজ অপরিকল্পিত না হয়। এ জন্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে যথাযথ সমীক্ষা শেষে উন্নয়নকাজ শুরুর দাবি জানাচ্ছি।’