বঙ্গোপসাগরের মধ্যে ভাসমান ৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপের বাসিন্দা সাড়ে ১০ হাজার। অধিকাংশের ঈদের আনন্দ নেই জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, দ্বীপের মানুষ অর্থসংকটে আছেন। বহু পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকায় টেকনাফ থেকে চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, তরকারিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্বীপে আনা যাচ্ছে না। ফলে পণ্যের সংকট ও দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। গত বছর দ্বীপের কোরবানি হয়েছিল শতাধিক গরু-মহিষ। এবার কোরবানি হয়েছে ৫০টির মতো।

পর্যটক নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসন

জীববৈচিত্র্য সুরক্ষাসহ সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল সীমিত করাসহ ১৩টি বিষয়ে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সর্বশেষ গত ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং টেকসই পর্যটন নীতিমালা ২০২২’ শীর্ষক নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সর্বশেষ বৈঠক।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দৈনিক ৯০০ পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হবে। যাঁরা দ্বীপ ভ্রমণে যাবেন, তাঁদের মাথাপিছু সরকারকে এক হাজার টাকা করে রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। আর যাঁরা দ্বীপের হোটেলে রাতযাপন করবেন, তাঁদের গুনতে হবে দুই হাজার টাকা। আগামী পর্যটন মৌসুম অর্থাৎ নভেম্বর থেকে এই নির্দেশনা কার্যকরের কথা থাকলেও এখন কেউ সেন্ট মার্টিন যেতে পারছেন না।

সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের টেকনাফ সদরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দেখাতে হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র।

সেন্ট মার্টিনে পর্যটকসহ বাইরের লোকজনের যাতায়াত নিষেধ জানিয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কায়সার খসরু প্রথম আলোকে বলেন, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় লোকজন টেকনাফ সদরে আসা-যাওয়া করতে পারেন। জরুরি প্রয়োজনে কারও সেন্ট মার্টিন যেতে হলে টেকনাফ ইউএনও কার্যালয়ের অনুমতি লাগে।

সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, সমিতির আওতায় কাঠের ট্রলার আছে ৩২টি। যাত্রী না থাকায় এখন টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচল করছে মাত্র তিনটি ট্রলার। স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া অন্য কাউকে ট্রলারে তোলা হয় না। কারণ, বাইরের লোকজনকে সেন্ট মার্টিনে নামতে দিচ্ছে না কোস্টগার্ড-পুলিশ। দ্বীপের বাসিন্দাদেরও টেকনাফ যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দা শনাক্তকরণের জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হচ্ছে।

default-image

রশিদ আহমদ বলেন, সমুদ্র উত্তাল এবং আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ঈদের আগের দিন থেকে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে কাঠের ট্রলার সার্ভিস চলাচল বন্ধ আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত মানুষের চাপে সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য অনেক আগেই ধ্বংস হয়েছে। অবশিষ্ট যা আছে, তা ধরে রাখতে নীতিমালা করছে সরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, সরকার ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল ৫২৯ হেক্টর আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। গত ৪ জানুয়ারি সরকার বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর ক্ষমতাবলে দ্বীপের অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৪৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকার ৭০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এলাকাকে ‘সেন্ট মার্টিন মেরিন প্রটেক্টেড এলাকা’ ঘোষণা করে।

খালি হোটেল-রিসোর্ট

দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা ও রিসোর্ট মালিক জয়নাল আবেদীন বলেন, গত বছরের ঈদের ছুটিতে হাজারো পর্যটক ছিলেন সৈকতে। এখন কেউ নেই। লোকজন না থাকায় ১৪৪টির মতো হোটেল–রিসোর্ট খালি পড়ে আছে।

উত্তর পাড়ার মৎস্য ব্যবসায়ী নবী হোসেন বলেন, ঈদের দিন থেকে সেন্ট মার্টিনে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। দ্বীপের মানুষেরা ঘরে বসেই সময় পার করছেন। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় ঈদের আনন্দ মাটি হচ্ছে।

সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিতকরণ, অনলাইনে নিবন্ধন এবং পর্যটকদের মাথাপিছু টাকা আদায়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলকারী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন কক্সবাজার (টুয়াক)।

জাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে বলেন, সেন্ট মার্টিনে পর্যটক সীমিত করার উদ্যোগ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখন স্বল্প খরচে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু অনলাইনে নিবন্ধন করে দৈনিক ৯০০ জনকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সুযোগ দিলে অবশিষ্ট হাজারো পর্যটক বিদেশে চলে যাবেন। দেশের অর্থ অপচয় করবেন। তখন পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত অন্তত তিন লাখ মানুষ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন