‘স্বামী বেঁচে আছেন কি না, জানি না; আমাদের ঘরে ঈদ হয়নি’
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও আশপাশের এলাকায় আরাকান আর্মির অপহরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত দেড় শতাধিক জেলে মিয়ানমারে আটক। এতে প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবার জীবিকা হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। এবারের ঈদও কেটেছে স্বজনহারা অপেক্ষা ও কান্নায়।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে ৩০টির মতো ছোট টিনের ঘর। বেশির ভাগ ঘরের চাল নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে টিনের চালের একাংশ। কিছু বাড়ির একপাশে টিনের বেড়াও নেই। সে জায়গায় দেওয়া হয়েছে বাঁশের চাঁটাই বা পলিথিন। ঘরগুলোর সামনে শিশু কোলে বসে ছিলেন কয়েকজন নারী। কেউ উঁকি দিচ্ছিলেন ঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে।
গতকাল বুধবার জালিয়াপাড়ার জেলেপল্লিতে গিয়ে কোনো প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেল না। বেড়িবাঁধ–সংলগ্ন এই পল্লির ৫০ জন জেলে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে বন্দী। এসব পরিবারের সদস্যরা কেমন ঈদ কাটিয়েছেন, জানতেই জালিয়াপাড়ায় যাওয়া।
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গ্রাম জালিয়াপাড়া। গ্রামটির পূর্ব পাশে নাফ নদীর অপর পারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুটাউনশিপ। এপার থেকে খালি চোখে ওপারের দৃশ্য দেখা যায়। কয়েক বছর ধরে ওই পারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন এপারের মানুষ। রাতে শুনেছেন গুলি ও বোমার শব্দ। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে এ তীরেও। এখানকার জেলেরা যেমন অপহরণের শিকার হয়েছেন, তেমনি সীমান্তে পেতে রাখা মাইনের আঘাতে আহতও হয়েছেন। আরাকান আর্মির ভয়ে নাফ নদীতে মাছ শিকারও এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে।
১৭ মার্চ সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন এই পাড়ারই জেলে রবি আলম। ছোট দুই সন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী সাবেকুন্নাহার স্বামী ছাড়া এই প্রথম ঈদ করলেন। তিনি জানেন না, স্বামী বেঁচে আছেন কি না। ঈদে নতুন কাপড়, ভালো খাবার দূরে থাক, দুই বেলার ভাত জোগাড় করতেও বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে। ঈদ কেমন হলো, জানত চাইলে শিশুসন্তানকে এক হাতে আঁকড়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে চোখ মোছেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের আবার ঈদ। স্বামীর আয়ে সংসার চলে। তিনি বেঁচে আছেন কি না, তা–ও জানতে পারছি না। যোগাযোগেরও কোনো সুযোগ নেই। ঈদে কোনো রান্না হয়নি। বাচ্চাদের কাপড় দিইনি।’
১৭ মার্চ সকালে নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপ বদরমোকাম চ্যানেল থেকে ধারে নিয়ে যাওয়া সাত জেলের সবার বাড়ি শাহপরীর দ্বীপের পূর্ব পাড়া ও জালিয়াপাড়ায়। রবি আলমের মতোই আবুল কালাম, মো. ছাদেক, আবদুল শুক্কুর, মঞ্জুর আলম, মো. রাসেল ও মো. শরিফের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এর এক মাস আগে জালিয়াপাড়ারই ৫ জেলে—শাহ আলম, মোহাম্মদ ইউনুস, আবুল হোসাইন, আব্দু সাহেদ ও মোহাম্মদ আব্বাসকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। তাঁদেরও কোনো খোঁজ জানেন না পরিবারের সদস্যরা। পাড়ার বাসিন্দারা জানালেন, ঈদে বেশির ভাগ জেলের ঘরে সেমাই রান্না হয়নি। নতুন কাপড় পরতেও দেখেননি কাউকে।
পাড়ার জেলে শাহ আলমের বিয়ে হয়েছে দুই বছর। নতুন সংসারে এখনো সবকিছুর জোগাড়যন্ত্র হয়নি। এর মধ্যেই দেড় মাস ধরে স্বামীর খোঁজ না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন নূর কলিমা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নূর কলিমা বলেন, ‘স্বামী বেঁচে আছেন কি না, সেটাও জানি না। প্রতিটা দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়, রাতে ঘুম হয় না।’
টেকনাফের কত জেলে এখনো আরাকান আর্মির হাতে বন্দী, এর সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে। তবে শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া জেলে সমিতির সভাপতি আবদুল গণির মতে, এখনো দেড় শর মতো জেলে বন্দী আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত দেড় বছরে আরাকান আর্মি ৫০টির বেশি নৌকাসহ চার শতাধিক জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। বিজিবির প্রচেষ্টায় কয়েক দফায় আড়াই শতাধিক জেলেকে ফেরত আনা হলেও আরও দেড় শতাধিক জেলে রাখাইনের বিভিন্ন জায়গায় আটকে আছেন।
আবদুল গণি আরও বলেন, মিয়ানমারে আটকে থাকা ১৩০ জেলে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। কোনো পরিবারে এবার ঈদ হয়নি। পরিবারগুলো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
এক পাড়ে যুদ্ধ, অন্য পাড়ে অনিশ্চয়তা
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গ্রাম জালিয়াপাড়া। গ্রামটির পূর্ব পাশে নাফ নদীর অপর পারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুটাউনশিপ। এপার থেকে খালি চোখে ওপারের দৃশ্য দেখা যায়। কয়েক বছর ধরে ওই পারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন এপারের মানুষ। রাতে শুনেছেন গুলি ও বোমার শব্দ। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে এ তীরেও। এখানকার জেলেরা যেমন অপহরণের শিকার হয়েছেন, তেমনি সীমান্তে পেতে রাখা মাইনের আঘাতে আহতও হয়েছেন। আরাকান আর্মির ভয়ে নাফ নদীতে মাছ শিকারও এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে।
গতকাল দুপুরে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড বাহিনী টহল দেখা গেল। ওপারে সে দেশের দখলদার আরাকান আর্মি টহল। নদীতে মাছ ধরার কোনো নৌকা নেই। নৌকাগুলো জালিয়াপাড়া ও শাহপরীর দ্বীপের কয়েকটি ঘাটে নোঙর করা আছে।
কারণ জানতে চাইলে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, নাফ নদীতে নামলেই আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যায়, গুলি চালায়। আরাকান আর্মির হাতে আটক রয়েছেন জালিয়াপাড়ার অন্তত ৫০ জন জেলে। তা ছাড়া নাফ নদীতে আগের মতো তেমন মাছও ধরা পড়ছে না। এ কারণে নাফ নদী জেলেশূন্য।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত শাহপরীর দ্বীপের ৮০ শতাংশ মানুষ মৎস্যজীবী। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত, রাখাইন রাজ্য নিয়ন্ত্রণে নেওয়া দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ভয়ে অন্তত ৩০ হাজার জেলে ঠিকমতো মাছ ধরতে পারছেন না।
টেকনাফের হ্নীলা এলাকার বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম কক্সবাজারের সভাপতি আবদুস শুক্কুর প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক মাস ধরে নাফ নদীর হোয়াইক্যং সীমান্তে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলি ও সংঘর্ষ লেগেই আছে। ওপার থেকে ছোড়া গুলি, মর্টারশেল, ড্রোন এসে পড়ছে এপারের ঘরবাড়িতে। অনেকে হতাহত হচ্ছেন। ওপারে থেকে ছোড়া গুলিতে সম্প্রতি হোয়াইক্যং এলাকার এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুও হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুঁতে রাখা স্থলমাইনে বাংলাদেশি কয়েকজন জেলে গুরুতর আহত হয়েছেন। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নাফ নদীতে মাছ শিকার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাতে অন্তত ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জীবন–জীবিকা হুমকির মুখে।
হোয়াইক্যং ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, ঈদের কয়েক দিন আগে থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখা গেলেও নাফের তীরের লোকজনের মনের আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। সবাই নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশের সীমান্ত চান।
জানতে চাইলে বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জলসীমানা অতিক্রমের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জেলেদের ফেরত আনতে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় দুই শতাধিক জেলেকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। অন্য জেলেদেরও ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।
একই কথা বললেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিমও। তিনি বলেন, অপহৃত জেলেদের ফেরত আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে বিজিবি।