ফরিদপুর-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর আগে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রার্থীর জয়ের রেকর্ড ছিল না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ঘটল ভিন্ন ঘটনা। ‘আওয়ামী লীগ–অধ্যুষিত’ এ এলাকায় এবার নির্বাচিত হলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লা।
বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ আসন। রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মতে, বোয়ালমারীতে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও বিএনপির অবস্থান অনেকটা কাছাকাছি। মধুখালীতে বিএনপির আধিক্য থাকলেও তা দলের বিজয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণে আলফাডাঙ্গা উপজেলার ভোট বরাবরই এ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে নিশ্চিত করে আসছে। আওয়ামী লীগবিহীন এবারের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লার বিজয়ে মূল ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগ–অধ্যুষিত আলফাডাঙ্গা উপজেলার ভোটাররা। একটি হয়রানিমূলক মামলাকে কেন্দ্র করে ভোটের মাঠে এমন ফলাফল এসেছে বলে মনে করছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা। এ ছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকেও দুষছেন দলের নেতা–কর্মীরা।
ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার ভোট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিন উপজেলাতেই জামায়াত প্রার্থী ইলিয়াস মোল্লা জয়লাভ করলেও সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে তিনি জিতেছেন আলফাডাঙ্গা উপজেলায়। তিনি মধুখালী উপজেলার বাসিন্দা হলেও সেখানে তিনি সবচেয়ে কম ভোটে জিতেছেন। এ উপজেলায় ধানের শীষের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার ভোটের ব্যবধান ১ হাজার ৬৬২ ভোট। বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের নিজ উপজেলা বোয়ালমারীতে জামায়াত প্রার্থী জিতেছেন ৯ হাজার ৮০৩ ভোটের ব্যবধানে। আলফাডাঙ্গায় জামায়াত প্রার্থী জিতেছেন ১৪ হাজার ৭৩২ ভোটের ব্যবধানে।
আওয়ামী লীগের দুর্গ আলফাডাঙ্গায় এত ভোটে জামায়াত প্রার্থীর জয়লাভের নেপথ্যের কারণ কী, তা জানতে এই প্রতিবেদক কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষ্য, মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, ছাত্র, শিক্ষকদের হয়রানি করার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ দলটির প্রার্থীর পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে আলফাডাঙ্গা পৌর সদরের বাসিন্দা বিএনপির সমর্থক দিনমজুর লাবলু সর্দারকে বাদী করে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের দুই সমর্থক উপজেলা আওয়ামী লীগের ২ নেতাসহ ১৭০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আড়াই থেকে তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে একটি মামলা করান।
এ মামলার বাদী একাধিকবার সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির কমিটিতে রাখার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে থানায় ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে সই নেওয়া হয়েছে, এর বাইরে ওই মামলার বিষয় কিংবা কাদের আসামি করা হয়েছে, এ ব্যাপারে তাঁর কোনো ধারণা নেই। কিন্তু এই হয়রানিমূলক মামলাকে পুঁজি করে নাসিরুল ইসলামের সমর্থক ওই দুই নেতা প্রতিনিয়ত আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারীর সব পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীদের হয়রানি করার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। ওই মামলার আসামি হিসেবে এখনো অনেক নেতা–কর্মী কারাগারে রয়েছেন।
বোয়ালমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথ্যা মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের হয়রানির প্রতিশোধ নিতে জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।’
আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম আকরাম হোসেন বলেন, দিনমজুর লাবলু সর্দারকে দিয়ে হয়রানিমূলক মামলা করে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী উপজেলার সব পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের যেভাবে অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে, তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এ নির্বাচনে। ওই হয়রানিমূলক মামলাটাই খন্দকার নাসিরুল ইসলাম তথা বিএনপির জন্য কাল হয়ে দেখা দেয়।
বিএনপি নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের কিছুদিন আগে ফরিদপুর-১ আসনের তিন উপজেলার বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। ওই তিন উপজেলার বিভক্ত বিএনপির মধ্যে কমিটিতে শুধু নাসিরুল ইসলামের সমর্থকদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ নিয়ে তীব্র আন্দোলনে নামে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির একাংশ। এ আন্দোলন আমলে নেওয়া হয়নি। বরং নির্বাচনের দুই দিন আগে স্থানীয় রাজনীতিতে নাসিরুল ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শামসুদ্দিন মিয়াসহ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঘটনাটি নাসিরুল ইসলামের বিপক্ষে বহিষ্কৃত নেতাদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত শামসুদ্দিন মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী সঠিক ছিল না। নির্বাচনে ধানের শীষ হারেনি, হেরেছেন নাসিরুল ইসলাম। এলাকায় তাঁর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিছুদিন আগে তিনি যে কমিটি করেছেন, ওই কমিটি নিয়ে বাণিজ্য হয়েছে। পাশাপাশি ওই কমিটিগুলোতে সভাপতি–সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে যাঁদের রাখা হয়েছে, তাঁদের কারও কেন্দ্রে জেতেনি ধানের শীষ।’
নিজের পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের ভোট তিনি পাননি। জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোট পেয়ে জিতেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁদের ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব না। জামায়াত ঠেকাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন সারি বেঁধে আমাকে ভোট দিয়েছেন।’
নিজের দলের কিছু অংশের ভোট পাননি বলেও দাবি নাসিরুলের। তিনি বলেন, দলের কিছু লোক বিএনপির বদলে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন।