মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে ‘সন্ধ্যার মতো ধূসর’ শীতের বিকেল
কনকনে হাওয়া বইছে। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। ঠান্ডা হাওয়ায় একটুতেই হাত-পা জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। হাওরপারে সেই হাওয়ার জোর আরও বেশি। পিলপিলে হাওয়া এসে খোলা ত্বকে কামড় বসায়। কুয়াশা তখনো অতটা গাঢ় হয়নি। তবে আকাশটা মেঘের মতো হালকা কুয়াশায় ঢেকে আছে। সূর্যের কোনো খোঁজ নেই। খ্রিষ্টীয় বছরের শেষ দিনের সূর্যাস্ত যেন অনেকটা চুপিসারে আড়ালে বিদায় নিতে চাইছিল।
মৌলভীবাজারের হাইল হাওরের বাইক্কা বিল এলাকাতে সেই সময়টিতে বিকেলটা সন্ধ্যার মতো ধূসর হয়ে আছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। কিছু পাখি বিলের পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু পাখি উড়ছে, কিছু পাখি বিলের টুকরা-টাকরা উঁচু স্থানে ঘুরছে। কনকনে বাতাস আর কুয়াশার ধূসরতা পুরো হাওরপারকে কেমন নির্জন বিষণ্ণ, ক্লান্ত করে রেখেছে। ঘুরতে আসা কিছু লোক মাথা মুড়ে বাইক্কা বিলের হিজল-করচ বনে ঘুরছেন, ছবি তুলছেন। পাখি দেখবেন বলে নানাদিকে ছুটছেন।
গত বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বরুণা এলাকা পার হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে হাইল হাওরের দেখা মেলে। উন্মুক্ত হাওরে বিকেলবেলার একচিলতে রোদের ঝিলিক ছিল, পথ পার হওয়ার আগেই সে আলো ফুরিয়ে যায়। বরুণা এলাকা পার হয়ে কিছুটা পশ্চিমে গেলে দেখা যায় মাঠের মধ্যে একটি স্থানে বাঁশের খুঁটিতে জাল পেতে রাখা আছে। বাতাসে জাল উড়ছে। এই জাল পাখি ধরার ফাঁদ। শীত এসেছে। হাওরে পরিযায়ী পাখিরা আসছে। রাতের বেলা উড়তে গিয়ে পাখিরা এ রকম জালে ধরা পড়ে।
পথের দুই পাশে কিছু ঘরবাড়ি, আর আছে অনেকগুলো মাছের খামার। হাওর যেখানে মিঠাপানির প্রাকৃতিক মাছের উৎস হওয়ার কথা, সেই হাওরকে ঘিরে এখন মাছ চাষের সব আয়োজন চলছে। মাছের খামারের মাঝ দিয়ে ছুটে যাওয়া সড়কের মধ্যে পাওয়া গেল একদল গরু বাড়ি ফিরছে, পেছনে রাখাল। এই গরুগুলো হাওরের শুকনো জমিতে সারা দিন চরে বেড়িয়েছে, ঘাস খুঁটে খেয়েছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, রাখাল সব কটা গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
গরুর গোটের পেছনে পেছনে হাঁটছেন খলিল মিয়া। তিনি বলেন, এই গরুগুলো তিনি রাখালি করেন। প্রতিটি গরুর জন্য মালিকের কাছ থেকে মাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পেয়ে থাকেন। এবার তাঁর রাখালিতে ৫০টির মতো গরু আছে। মাসখানেক ধরে এই গরু চরানোর কাজ শুরু করেছেন। হাওরে পানি আসার আগপর্যন্ত এই গরু তাঁর কাছে থাকবে। বাইক্কা বিল এলাকাতেই তাঁর বাড়ি।
বেশ কিছু নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোরকে বিলের পাড়ে ঘুরতে দেখা গেল। এই পর্যটকেরা পাখি দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন। বিলপারের হিজল-করচের বনে তারা দলবেঁধে ঘুরছেন। কেউ কেউ ছবি তুলছেন। পানি নেমে গেছে সেই কোনো এক কার্তিকের দিনে। এলোমেলো, সারি ধরে হিজল-করচের গাছগুলো এখন দাঁড়িয়ে আছে। হিজল-করচের বনের নিচ এখন ঝকঝকে হয়ে আছে। কিছু ঝরাপাতা পড়ে আছে নিচে। গাছের নিচের স্থানটিকে মনে হয় কেউ ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে। স্থানটি এখন রীতিমতো বন হয়ে উঠেছে। দূর থেকে বনের মতো মনে হয়।
পর্যটক টাওয়ারের কাছে দীর্ঘ হয়ে ওঠা ঘাসবনে ফুটেছেÑকাশফুলের মতো ফুল। টাওয়ারের ওপরে ওঠার সিঁড়ির দরজা বন্ধ। টাওয়ারের আশপাশে কিছু নীল রঙের কালেম পাখি, কিছু সাদা বক এবং হাওরপারের মানুষের পোষা হাঁস একসঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিলের পানিতে এক-দুটা পানকৌড়ি সাঁতার কাটছে। বাইক্কা বিলের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে পানিতে বেশ কিছু পাখি ঝাঁকবেঁধে ভেসে আছে। কখনো তারা উড়াল দিচ্ছে, তারপর এক-দুই চক্কর দিয়ে আবার টলটলে পানিতে নেমে আসছে। তবে এ বছর এখনো খুব বেশি পাখি বিলে আসেনি। এবার বিলে পদ্মফুল ফোটেনি। পদ্মপাতা না থাকায় পাখিদের বসার জায়গাও কমে গেছে। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। কোনো কিছুই স্পষ্ট করে বোঝা যায় না।
বাইক্কা বিলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সংগঠন বড় গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আবদুল হামিদ বলেন, ‘এবার পাখি কম আইছে (এসেছে)। এবার পদ্মফুল না অওয়ায় (হওয়ায়) পাখি বওয়ার (বসার) জায়গা পার (পাচ্ছে) না। যা আইছে, তারা কান্দিত বয় (বিলের পাড়ের উঁচু স্থানে বসে)।’
আবদুল হামিদ বলেন, বাইক্কা বিলে কাউকে মাছ ধরতে ও পাখি শিকার করতে দেওয়া হয় না। তাঁরা প্রায়ই রাতের বেলা বিলে গিয়ে অবৈধভাবে পেতে রাখা জাল উদ্ধার করেন। পরে এই জাল কেটে পুড়িয়ে ফেলেন।
ততক্ষণে নিঝুম সন্ধ্যা নেমেছে বাইক্কা বিলের বুকে। বিলের চারপাশে শীতল নীরবতা ও অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। হঠাৎ এক-দুজন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া ছাড়া সারা হাওরটাই তখন শান্ত হয়ে গেছে। শীতের দিনে গায়ে ওমকুড়ানো কাঁথা জড়িয়ে যেন ঘুমের প্রস্তুতি চলছে চারদিকে।