লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুরাকুঠি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছে মাহমুদ আল হাসান মাসরিক। সেই সুবাদে লালমনিরহাট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল সকাল হাজির হয় সে। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মঞ্চে ডাক পড়ে অটোরিকশাচালক বাবার ছেলে মাহমুদের। এরপর অভাবের সংসারে কষ্ট করে পড়ালেখা করে সাফল্য অর্জনের গল্প শোনায় সে।
মাহমুদ আল হাসান বলে, ‘আমি মনে করি, এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া ভালো ফলাফলের একটা প্রমাণ বা স্মারক, তবে সামনে সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সংবর্ধনা পাওয়ায় মন খুশিতে ভরে গেলো। এত বড় অনুষ্ঠানে কিছু বলতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।’
চার শতাধিক শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবকসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে আজ বুধবার সকাল ১০টায় শুরু হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে লালমনিরহাট সদরের হাড়িভাঙ্গায় অবস্থিত আরডিআরএস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রের ১৩ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পী।
প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৬৪ জেলায় ‘জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা ২০২৬’ আয়োজন করা হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর লালমনিরহাট প্রতিনিধি আবদুর রব। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানের বক্তব্য পাঠ করেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লালমনিরহাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবু ইমাম মো. রাশেদুন্নবী বলেন, শিক্ষার্থীরা একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে জড়িত হলে সুকুমারবৃত্তির বিকাশ হবে, মানবিক ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। কৃতী শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার পরামর্শ দেন লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননাপ্রাপ্ত তউহিদুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, ‘কৃতী শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, যা–ই হও না কেন, সবার আগে মানুষ হতে হবে। আমাদের অমানুষের দরকার নেই।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন লালমনিরহাট সরকারি মজিদা খাতুন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ কুমার রায় ও লালমনিরহাট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রোখসানা পারভীন।
কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুভূতি প্রকাশ করে আরও বক্তব্য দেন ক্যানসারজয়ী অদম্য মেধাবী উম্মে কুলছুম রুমানা। সে বলে, ‘আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্যানসারে আক্রান্ত হই। মধ্যে এক বছর পড়াশোনা ঠিকভাবে করতে পারিনি। ভারত ও বাংলাদেশে চিকিৎসা নিয়ে আবার জোরদারভাবে পড়াশোনা শুরু করি। শহরের স্কুল থেকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি হই, চলাচলের সমস্যা হতো বলে। বাবা মা ও শিক্ষকদের উৎসাহ–অনুপ্রেরণায় এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছি। শিখো–প্রথম আলোর জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আমার সঙ্গে আমার মা এসেছেন, তিনিও খুশি। আমি এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’
লালমনিরহাট বন্ধুসভার উপদেষ্টা রক্তিম মিলনের সঞ্চালনায় মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প শোনা পর্বে বক্তব্য দেন প্রকৌশলী মাজেদ রায়হান। তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে একজন উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শোনান। মাদকের বিরুদ্ধে শপথ করান প্রথম আলো বন্ধুসভার লালমনিরহাটের সভাপতি ফারাহ নাজ নাহার। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন প্রথম আলোর রংপুরের সাবেক নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরডিআরএস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। একক, দলীয় সংগীত ও নৃত্য উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ জনকে উপহার হিসেবে বই ও পত্রিকা তুলে দেন অতিথিরা।