কাগজের কলম বানিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুলের স্বপ্নের পথচলা
গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন কাগজ মেপে মেপে কাটছেন শরিফুল ইসলাম। কাগজে আঠা লাগিয়ে ভেতরে কলমের শিষ ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি করছেন কলম। গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়।
জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল (২৯)। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়েছেন। এরপর অডিও শুনে ও শ্রুতলেখকের সহযোগিতায় এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অর্থসংকটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে খাতা ও পরে কাগজের কলম বানানো শুরু করেন। সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া আয়েই নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি।
২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন শরিফুল। ২০১৮ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। ২০২১ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন।
শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম (৭৬) মুদিদোকানি। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। দুই বোন রাশেদা ও ফরিদার বিয়ে হয়েছে। দুই ভাই শহিদুল ও মোস্তফা ঢাকায় পোশাকশ্রমিকের কাজ করেন। ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকার তানিয়া আকতারের সঙ্গে শরিফুলের বিয়ে হয়।
‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।’
২০২৩ সালের মার্চ মাসে শরিফুল খাতা তৈরির কাজ শুরু করেন। কাগজ কিনে খাতা তৈরি করে বিক্রি করতেন। মাসিক আয় হতো প্রায় এক হাজার টাকা। ওই বছরের অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরির কথা জানতে পারেন। স্থানীয় এক বন্ধুর মাধ্যমে ফেসবুকে যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার খোঁজ পান। তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরি করতেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ১০০টি কলম কিনে নেন শরিফুল। একই সঙ্গে কলম তৈরির পদ্ধতিও শিখে নেন। এরপর নভেম্বর মাসে তিনি নিজেই কলম বানানো শুরু করেন।
শরিফুল তাঁর কলমের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’। তাঁর মতে, এই কলম অনেকটাই পরিবেশবান্ধব। তিনি বলেন, ‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এই কাজ করতে চাই; কিন্তু মূলধনের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী কলম ও খাতা তৈরি করতে পারছি না।’
একটি কলম তৈরিতে শরিফুলের খরচ হয় ৬ টাকা, বিক্রি করেন ১০ টাকায়। বর্তমানে দিনে প্রায় ৫০টি কলম তৈরি করতে পারেন। পাশাপাশি দিনে প্রায় ১০০টি খাতা তৈরি করেন। প্রতিটি খাতা তৈরিতে খরচ ১৫ টাকা, বিক্রি করেন ২০ টাকায়। এসব কাজে সহযোগিতা করেন তাঁর স্ত্রী তানিয়া আকতার। বাড়িতে তৈরি এসব কলম ও খাতা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানে পাইকারি বিক্রি করেন শরিফুল।
মা–বাবা ও স্ত্রীকে নিয়ে একই পরিবারে থাকেন শরিফুল। সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারে তাঁর ‘শরিফুল পেপার হাউস’ নামের একটি ছোট দোকান আছে। দোকানের ভাড়া মাসে ৫০০ টাকা। প্রতি মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার খাতা–কলম বিক্রি করেন তিনি। খরচ বাদ দিয়ে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। তবে এ আয়ে সংসার চলে না। বাবা রফিকুল ইসলামের মুদিদোকানের আয়ে সংসারের বেশির ভাগ খরচ চলে।
তানিয়া আকতার বলেন, ‘স্বামী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তাঁকে নিয়ে আমি গর্বিত। সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিই।’
শরিফুল সমাজের বোঝা হয়ে থাকেননি উল্লেখ করে পুলবন্দি গ্রামের স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিজের মেধা ও ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় বাণিজ্যমেলা শুরু হবে। মেলায় কলম ও খাতা বিক্রির জন্য একটি স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন শরিফুল। আয়োজক গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টল থাকবে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।