প্রিয় শিক্ষার্থীকে নিজের আঁকা ছবি উপহার দিলেন এস এম সুলতানের শিষ্য

নড়াইলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাসকে নিজের আঁকা ছবি উপহার দিচ্ছেন শিল্পী ধর্মদাস মল্লিক। বুধবার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

দিনমজুর পরিবারে জন্ম। অর্থাভাবে পড়াশোনা আটকে যেতে বসেছিল। এরপরও দমে যায়নি পূজা বিশ্বাস। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের ফলে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। বুধবার নড়াইলে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিল সে। পূজার জন্য নিজের হাতে আঁকা ছবি এনেছিলেন তারই শিক্ষক ও শিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিক। মঞ্চেই সেই উপহার পূজার হাতে তুলে দেন তিনি।

বুধবার নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিখো–প্রথম আলোর উদ্যোগে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন শিল্পী ধর্মদাস মল্লিক। একই অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থী হিসেবে হাজির হয় পূজা, যে একসময় ধর্মদাস মল্লিকের অবৈতনিক ‘চারুকুঠি শিল্পালয়ে’ ছবি আঁকা শিখত। পূজা আসবে জেনে তিনি নিজের কাঁধ ব্যাগে করে তার জন্য একটি ছবি নিয়ে আসেন।

অনুষ্ঠানে ধর্মদাস মল্লিক বলেন, ‘শহর ছেড়ে গ্রামে অবৈতনিক স্কুল করে আমার আজ নিজেকে সার্থক মনে হচ্ছে। আজ সেখানকার একজন শিক্ষার্থী এখানে এসেছে, কথা বলেছে। অনেকে ভাবেন, শিল্পচর্চা মানুষকে পড়ালেখা থেকে দূরে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই কথা যে সত্য নয়, তার একটি উদাহরণ পূজা বিশ্বাস। সে আমার প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর ছবি আঁকা ও আত্মোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চর্চা করেছে। পূজা আমার সঙ্গে এই শিল্পকলার এক মেলায় টেরাকোটা পণ্যও বিক্রি করেছে।’

নড়াইলে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। বুধবার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

পূজা বিশ্বাস নড়াইল সদর উপজেলার নলদীরচর এলাকার দিনমজুর নিত্য গোপাল বিশ্বাস ও গৃহিণী দীপ্তি বিশ্বাসের মেয়ে। জরাজীর্ণ ঘর থেকে স্থানীয় কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

অনুষ্ঠানে পূজা বলে, ‘আমি একজন ভালো চিকিৎসক হতে চাই। গরিব মানুষের সেবা করতে চাই। জানি না অর্থের অভাবে এই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না। যদি হয়, আমার মতো অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

নড়াইলে কৃতী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরা। বুধবার জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এরপর স্বাগত বক্তব্যে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রথম আলোর নড়াইল প্রতিনিধি রাজু শেখ। অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

কাজী আলিম-উজ-জামান বলেন, ‘জিপিএ-৫ পাওয়ায় তোমাদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের অহংকারবোধের জন্ম না দেয়। তোমরা বড় হও, দেশ- বিদেশে গিয়ে বড় চাকরি করো। কিন্তু শৈশবের শিক্ষাগুরু, মা–বাবা, এমনকি যে বন্ধুটি আজ জিপিএ-৫ পায়নি, তাকে ভুলে যেও না।’

অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করছেন স্থানীয় দুই শিল্পী। বুধবার সকালে নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রাক্তন সহকারী শিক্ষক ও পটশিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘এসএসসি কৃতী শিক্ষার্থীদের প্রথম ধাপ। তোমাদের পথ অনেক লম্বা। সেই পথ অতিক্রম করতে হলে অনেক কষ্ট করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে। সমাজে ডাক্তার আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে, বড় বড় অফিসার আছে; কিন্তু ভালো মানুষ নেই। তোমরা বড় হয়ে ভালো মানুষ হও।’

প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা মো. মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান, শিক্ষক মাহবুবর রশীদ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন, কেউ গান গেয়ে, কেউ আবৃত্তি করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। এ ছাড়া স্থানীয় শিল্পীদের গান ও নৃত্যে জমে ওঠে আয়োজন।