শীতের কাকডাকা ভোর থেকে বগুড়া শহরের শ্রমজীবী মানুষের হাঁকডাক শোনা যায়। গ্রাম থেকে দরিদ্র শ্রমজীবী বহু মানুষ এসেছেন শহরের শ্রম বেচাকেনার হাটে। সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন তাঁরা। কারও হাতে কর্নি, কোদাল, টুকরি; আবার কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি, কাস্তে। কেউ হাতে রেখেছেন ভবনে রং-চুনকাম করার বিভিন্ন আকারের ব্রাশ। তবু ক্রেতা কম। এ কারণে অনেক শ্রমিক কাজ না পেয়ে সমস্যায় পড়েছেন।
প্রতিদিন ভোরে বগুড়ার কলোনি এলাকায় এই শ্রমের হাট বসে। নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হওয়ায় শ্রমের বাজারে এখন মন্দা। বেশির ভাগ শ্রমিক কাজ পাচ্ছেন না। তবু কাজের আশায় তাঁরা হাটে এসেছেন। গতকাল শনিবার ভোরে শ্রম বিক্রির জন্য বসে থাকা এসব মানুষের সঙ্গে শুরু হয় ভোটের আলাপ।
রাজমিস্ত্রির সহকারী আনোয়ার প্রামাণিক প্রতিদিন ভোরে গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের নিজ গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে এই হাটে আসেন। গতকালও তিনি ক্রেতার আশায় বসে ছিলেন। সকাল আটটা বেজে গেলেও কেউ তাঁকে কাজের জন্য নেননি। ভোটের প্রসঙ্গ উঠতেই সত্তোর্ধ্ব আনোয়ার প্রামাণিক বলেন, ‘ম্যালা দিন হয় ভোট দিবারই পারিনি। সেন্টারত যাওয়ার পর শুনচি, ভোট হয়্যা গেচে। হামার ভোট হামি দিতে পারিন, আগে জিন-পরিরা ব্যালটত সিল দিয়্যা গেচে। শুনিচ্চি, এইবার ভালো ভোট হবি। ম্যালা দিন পর এইবার ভোট দিবার পারমু।’ মার্কা, নাকি প্রার্থী কী দেখে ভোট দেবেন? আনোয়ার প্রামাণিক গম্ভীর কন্ঠে বলেন, ‘খালেদা জিয়া হামাকেরে ব্যাটার বউ আচলো। তাক দেখেই হামরাই ভোট দিচি। এইবার মার্কা দেখেই ভোট দ্যামো।’
ভোটের পর নতুন সরকারের কাছে কী চান—শ্রমের হাটে আসা গাবতলী উপজেলার নিজগ্রামের ঠান্ডু মিয়া (৫৫) বলেন, ‘চাই তো হামরা অনেক কিছুই, কিন্তু চাইলে পরে তো লিজের বাপ-মাও সবকিছু দিবার পারে না। সরকার কুনিটে থ্যাকে দিবি? ভোটে যে সরকারই আসুক, গরিবের কপালে ভালো আর কি জুটপি?’
ধুনট উপজেলার চুনিয়াহাটা গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব আলম মিয়া বলেন, ‘সরকারত যে যাক, হামরা ভাতা চাই না, কাজ চাই। বগুড়াত বেশি বেশি কলকারখানা চাই। কাজ করে প্যাট চালাবার চাই।’
কেমন ভোট চান—ইকবাল হোসেন নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘ম্যালা দিন পর এইবার সব দল লিয়ে ভোট হচ্চে। এবারের ভোটটা ভালো হোক, ভোটত সব দল থাকুক। দিনের ভোট রাতে না হোক। দ্যাশটা ভালো থাকুক। ভোট আসলেই গরিবের কদর বাড়ে, মুখে মধু ঝরে। হাজারবার সালাম দেয়। ভোট হলে পাল্টে যায়, দরজা বন্ধ করে দেয়। আম খাওয়ার পরে বোঝা যায় আমডা টক। ভোট শ্যাষ হলে বোঝা যায়, নেতা কত ভালো লোক।’
আনিসার শেখ নামের একজন বলেন, ‘ম্যালা দিন পর এইবার ভোটত উৎসব উৎসব লাগিচ্চে। মার্কা লিয়ে প্রতিদিন লেতারা ভোট চাবার আসিচ্চে। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা মার্কার সাথে এবার “হ্যাঁ” ভোটও আচে। কেউ কেউ কচ্চে “হ্যাঁ” মার্কা লিয়ে নাকি ইউনূস সরকার দাঁড়াইচে। সরকারের সগলি খালি “হ্যাঁ” ভোটও চাচ্চে। সরকারত থ্যাকে ক্যাম্বা করে “হ্যাঁ” ভোটত দাঁড়ায়, সেডা খালি বুঝবার পারিচ্চি না।’