প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে আনা ‘শাক পিতারি’ উৎসব

‘শাক পিতারি’ উৎসবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রান্না করা বিভিন্ন রকমের শাক। শুক্রবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

সকাল গড়িয়ে দুপুর। সূর্য তখনো জাগেনি। প্রকৃতিতে শীতের তীব্র দাপট। বেলা বাড়তেই আকাশে উঁকি দেয় সূর্য। উষ্ণতার পরশে নারীরা দল বেঁধে ছুটে আসেন সোনাপাতিলা গ্রামের পুকুরপাড়ের দিকে। তাঁদের কারও হাতে থলে, কারও হাতে রকমারি সব বাটি। তাঁরা এসেছেন ‘শাক পিতারি’ উৎসবে।

সোনাপাতিলা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একটি গ্রাম। এ গ্রামে গতকাল শুক্রবার হয়ে গেল এক ব্যতিক্রমী বুনো শাকের উৎসব। গ্রামের নারীরা বাড়ির পাশের খেতখামার, ঝোপঝাড়, পুকুরপাড়, জমির আল থেকে শাক কুড়িয়ে রান্না করে নিয়ে আসেন এই উৎসবে। নান্দনিকভাবে সাজিয়ে দেন টেবিলে। উপস্থিত লোকজন রান্না করা সেসব শাক ঘুরে ঘুরে দেখেন। অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের রান্নার প্রধান উপকরণ বুনো শাক সম্পর্কে উপস্থিত সবাইকে সচেতন করেন। প্রদর্শনীর পর গ্রামের সবাই একসঙ্গে বসে শাক আর গরম ভাত খান।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় গ্রামের নারীদের অংশগ্রহণে এই শাকের উৎসবের আয়োজক ‘গিদরী বাউলি’ নামে একটি সংস্থা।

শুক্রবার দুপুরে সোনাপাতিলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুকুরপাড়ের গাছতলায় টাঙানো বর্ণিল কয়েকটি শামিয়ানা। শামিয়ানার নিচে কালাপাতা, কচুপাতা দিয়ে সাজানো বাটি। আর তাতে নানা প্রজাতির রান্না করা শাক। সেসব ঘিরে চলছে গীতসহ নানা পরিবেশনা। লোকজন ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ প্রশ্ন করলে দলের প্রতিনিধিরা উত্তর দিচ্ছেন।

সোনাপাতিলার পাশের গ্রাম বইথপাড়া। ওই গ্রামের বাসিন্দা লিপি রানীসহ তিন নারী মিলে ১৪ পদের শাক উৎসবে নিয়ে এসেছেন। লিপি রানী জানান, একসময় বাঙালির মধ্যাহ্নভোজের প্রথম ব্যঞ্জন ছিল শাক। এমনকি নিমন্ত্রণে অতিথিদের প্রথম পাতে শাক পরিবেশনের চল ছিল। কালে কালে শহুরে মানুষ শাক থেকে দূরে সরেছে। পাতে শাক পড়লে এখন অনেকেই ভ্রু কোঁচকান। তবে তাঁদের মধ্যে (হিন্দু সম্প্রদায়) কালীপূজার আগের দিন অর্থাৎ ভূত চতুর্দশীতে ওলশাক, কেউ, বেতো, কালকাসুন্দে, নিমপাতা, জয়ন্তী, শর্ষে, সাঞ্চে, হেলেঞ্চা, পলতা, শুল্কা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি—এই ১৪ প্রকার শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে। তিনি আরও জানালেন, আয়ুর্বেদ অনুযায়ীই এই শাক খাওয়ার রীতি চালু হয়েছিল। বর্ষার শেষে শাক খেতে হয়। তার ওপরে ঋতু পরিবর্তনের সময় নানা ধরনের রোগ হয়। তা নিরাময়ের জন্যও এই শাক খাওয়ার চল হয়েছে।

উপস্থাপন করা হচ্ছে শাক নিয়ে গীত
ছবি: প্রথম আলো

সোনাপাতিলা গ্রামের সাহিদা বেগম বলেন, তিনি এখানে চার পদের শাক রান্না করে এসেছেন।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজিনা বেগম বলেন, ‘চার বছর থাকিয়া এই মেলা হচ্চে। প্রতিবারই শাক রান্না করে আনিছি। এইবার পারু নাই। তাতে কী? মেলা তো হামারই।’

পুকুরপাড়ের গাছে গাছে টাঙানো রঙিন কাগজে নানা ধরনের ছবি। সবই শাক নিয়ে। তাতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে শাকের গুণাবলি। সেসব ছবি এঁকেছে গ্রামের ছেলেমেয়েরা। তাদের একজন বালিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী পূজা বর্মণ। সে বলে, ‘আমরা এই আয়োজনের জন্য আশপাশে বেড়ে ওঠা শাকগুলো দিয়ে ছবি করেছি। সেখানে আবার শাকের উপকারিতাও লিখে দিয়েছি।’

একসময় শাকের স্বাদ নেওয়ার ঘোষণা এল। পুকুরের চারধারে খড় বিছিয়ে বসে পড়লেন নারী-শিশুরা। তাঁদের দেওয়া হলো কলাপাতা। তাতে দেওয়া হল গরম ভাত। তারপর একে একে তুলে দেওয়া হলো রান্না করে আনা সেসব শাক। খাওয়া শেষে সত্তরোর্ধ্ব নারী কুলসুম বেগম বলেন, ‘আইজ ১৬ পদের শাক আর ডাইল দিয়া ভাত খানু। খায়ে খুব মজা পানু।’

খাবার পরিবেশন করতে করতে ভুল্লী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী তিথি রানী বলে, ‘একসময় আমাদের গ্রাম নানা শাকে ভরা ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন কারণে সেসব হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে শাকের উপকারিতা সম্পর্কে জানিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্যই এই আয়োজন।’

উৎসবে এসেছে ঠাকুরগাঁও শহরের সরকারপাড়া এলাকার শিক্ষার্থী চৌধুরী ফারদীন। সে বলে, ‘আমি গুনে দেখেছি, এখানে ৮০ পদের রান্না করা শাক আনা হয়েছে। যার বেশির ভাগ আমি চিনি না।’

শহরের সালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি অনন্য আয়োজন। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একাকার হয়ে যায়। এমন আয়োজন থেকে আমরা ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতারও বার্তা পাই।’

পুকুরপাড়ে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছেন
ছবি: প্রথম আলো

খাবার শেষে আবার গাছতলায় ফিরে এলেন তাঁরা। সেখানে চলল গীত, শ্লোক আর নানা পরিবেশনা। বিকেলে পরিবেশন করা হলো গরম জিলাপি ও মুড়ি। সেসব খেতে খেতে বাড়ির দিকে ফিরে যেতে শুরু করলেন সবাই।

আয়োজন সম্পর্কে গিদরী বাউলির রিসার্চ অ্যান্ড প্ল্যানিং ডিরেক্টর সালমা জামাল বলেন, ‘ছোট্ট পরিসরে শাক পিতারির আয়োজনটি চার বছর আগে শুরু হয়েছিল। আমরা বাড়ির আশপাশে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা শাক নিয়ে কম ভাবি। আগাছানাশক ব্যবহার করায় এসব শাক উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গা থেকেই এই আয়োজনের ভাবনাটি আসে। প্রতিবছরই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এখন আয়োজনটি উৎসবে রূপ নিয়েছে। কোন শাকের কী নাম, কী উপকার, তা এ প্রজন্ম জানে না। এখানে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাটিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’