চট্টগ্রামের সেই সলিমপুরে যেভাবে চলছে ভোট

সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরের এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টার দিকেছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর। সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগর–সংলগ্ন এই এলাকার অধিকাংশ বসতি। স্বাভাবিক সময়ে এলাকাটিতে বাইরের কেউ গেলেই বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এলাকাটিতে গিয়ে হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখা গেল এলাকাটিতে।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি পড়েছে চট্টগ্রাম-৪ আসনে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এলাকাটি ঘুরে দেখা হয়। এলাকাটিতে ঢুকতে গিয়ে অন্য সময়ে বাধার মুখে পড়তে হলেও আজ তেমন কোনো পরিস্থিতির শিকার হতে হয়নি।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি লিংক রোড। এই সড়ক থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে জঙ্গল সলিমপুরে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের বাইরে উৎসুক জনতার ভিড়। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখাসহ বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকেরা বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন।

কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে নারী-পুরুষের পৃথক সারি চোখে পড়ে। নারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ারা বেগম নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সকাল আটটায় এসেছেন ভোট দিতে। মানুষের ভিড়ের কারণে দুই ঘণ্টায়ও ভোট দিতে পারেননি।

কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বের হয়ে আসছিলেন জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দা রোকিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘ভোট দিতে আসার আগে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করেছে। তবে ভোটকেন্দ্রে আসার পর মনে হয়েছে সবকিছুই স্বাভাবিক।’

জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে প্রায়ই হানাহানি, সংঘর্ষ লেগে থাকে। এলাকার অবৈধ বসতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় সম্প্রতি একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে দুটি ‘সন্ত্রাসী’ দলের মধ্যে। আনোয়ারা বেগম ও রোকিয়া বেগম দুজনেরই প্রত্যাশা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকায় শান্তি ফেরাতে উদ্যোগ নেবেন।

আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই সব সময় আমাদের এই এলাকা শান্ত থাকুক। এলাকায় কে বৈধ, কে অবৈধ বসতিতে, তা আমরা বুঝি না। অবৈধভাবে কেউ থাকলে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে উচ্ছেদ করবে। সরকারের কাছে চাওয়া আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই যাতে হারিয়ে না যায়।’

ভোটকেন্দ্রে কথা হয় বৃদ্ধ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিছি। কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা চাই, আমাদের যাতে উচ্ছেদ করা না হয়। উচ্ছেদ করলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।’

এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা কাজী মোহাম্মদ সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, এখানে মোট ভোটার রয়েছেন ৭ হাজার ১১৬ জন। বেলা ১১টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হয়েছে ১ হাজার ১১৬। তিনি আরও বলেন, ‘এই কেন্দ্রে দায়িত্ব পাওয়ার পর শুরুতে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করেছিল। তবে গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা রয়েছে। সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ হচ্ছে। ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত আশা করি পরিস্থিতি শান্ত থাকবে।’

কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সীতাকুণ্ড থানার এসআই ইদ্রিস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর এখানকার লোকজন ভোট দিতে পারছেন। তাঁরা খুশি। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নিরাপদে ভোট দিতে আসতে পারছেন ভোটাররা।’

ভোটকেন্দ্রের বাইরে কথা হয় ওই আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর ভাই আজম চৌধুরী সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে জঙ্গল সলিমপুর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী নেই। লোকজন নিরাপদে ভোট দিচ্ছে।’

গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুর অভিযানে থাকা র‍্যাব সদস্যদের ওপর মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে র‍্যাবের পাঁচ সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থলে মারা যান র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এই ঘটনায় করা মামলায় ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

৯০ দশক থেকে সরকারি খাস জমি দখল করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে রোকন উদ্দিন ও ইয়াসিনের অনুসারীরা জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। র‍্যাব কর্মকর্তা গত মাসে নিহত হওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুর সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। কিন্তু এখনো অভিযান শুরু হয়নি।

র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান গতকাল বুধবার ব্রিফিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে কেউ ঝামেলা করতে চাইলে শায়েস্তা করা হবে। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’