জ্বালানি তেল
সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠল
ডিপো থেকে তেল ‘গায়েব’, ট্যাংকারে হিসাবের গরমিল; এসব ঘটনা ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল সরবরাহের জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির চেষ্টা হয়েছে। এই ঘটনার পর জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
তেল চোর চক্রকে যেন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। ডিপো থেকে তেল ‘গায়েব’, ট্যাংকারে হিসাবের গরমিল; এসব ঘটনা ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল সরবরাহের জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির চেষ্টা হয়েছে। এই ঘটনার পর জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদী ফকিরহাট রাস্তার পশ্চিম পাশে। সেখানে মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে থাকা ডিজেল পরিবহন পাইপলাইনে ছিদ্র করা হয়। ছিদ্র দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তেল বেরিয়ে এসে সড়কে ছড়িয়ে পড়লে ৮ জানুয়ারি বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে ওই লাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে গত রোববার সকালে আবার ডিজেল সরবরাহ শুরু করা হয়।
বিপিসি ও পুলিশ সূত্র জানায়, পাইপলাইনের ঠিক ওপরেই একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আফসার। পরে ঘরটি তিনি ভাড়া দেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলামের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘর ভাড়া নেওয়ার পর আমিরুল পরিকল্পিতভাবে মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন পর্যন্ত পৌঁছান এবং সেখানে ছিদ্র করেন। এরপর পাইপলাইনের সঙ্গে আলাদা একটি পাইপ ও মিটার বসিয়ে তেল চুরির প্রস্তুতি নেন।
পাইপলাইনের ছিদ্রের ঘটনা সরেজমিন দেখতে যান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তেল চোর চক্র মূল পাইপলাইনের সঙ্গে অন্য একটি পাইপ ও মিটার সংযুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে সংযোগস্থলে ঝালাই করতে গিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ হারায়। পাইপলাইনে তেলের চাপ বেশি থাকায় ছিদ্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বেরিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। সেই তেল সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
পাইপলাইন ফুটোর ঘটনায় হাতেনাতে তেলসহ আটক কাউকে আটক করা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, এত গভীরে থাকা একটি পাইপলাইনে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করা সম্ভব হলো। স্থানীয় প্রশাসন, বিপিসি কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে এই প্রস্তুতি কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বিপিসি এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এখনো ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
এই ঘটনায় কাউকে হাতেনাতে তেলসহ আটক করা না গেলেও প্রশ্ন উঠেছে, এত গভীরে থাকা একটি পাইপলাইনে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করা সম্ভব হলো। স্থানীয় প্রশাসন, বিপিসি কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে এই প্রস্তুতি কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বিপিসি এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এখনো ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কারও গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেন্সর থাকলেও কেন ধরা পড়ল না?
৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বিপিসির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ এই পাইপলাইনের সঙ্গে সেন্সরযুক্ত একটি কেবল সংযুক্ত রয়েছে। পাইপলাইনে কোথাও চাপের পরিবর্তন, ফাটল বা ছিদ্র হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পৌঁছানোর কথা নিয়ন্ত্রণকক্ষে। কিন্তু সর্বশেষ এই ঘটনায় কোনো সংকেত পৌঁছায়নি, কোনো স্বয়ংক্রিয় সতর্কতাও পাওয়া যায়নি—এ তথ্য জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক বলেন, প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এখনো সম্ভব হয়নি। সেন্সরসহ সব প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ শেষ হতে আরও এক বছর সময় লাগবে। তখন পুরো ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করবে। আপাতত প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর একজন করে লোক পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন। পাশাপাশি পাইপলাইনের ওপর যেসব ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই পাইপলাইন নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল তেল চুরি রোধ এবং নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো ডিজেল ঢাকায় পৌঁছে পরিমাণে কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই পাইপলাইনে তেল পাঠিয়েছে। এ নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে গত ৭ ডিসেম্বর একটি কমিটি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে তেলের হিসাবে গরমিলের তথ্য উঠে আসে।
ঝুঁকি কোথায়?
বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের গড় বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮ লাখ টন, যার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, শিল্প ও পরিবহন—সব খানেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ এ একটি পাইপলাইন দেশের মোট ডিজেল চাহিদার বড় অংশ বহন করে। ফলে এই অবকাঠামোতে সামান্য বিঘ্ন–জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর একজন করে লোক বসিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা যদি মূলত মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের ওপর অবৈধ স্থাপনা, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং দুর্বল নজরদারি মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি চালু করলেই এই ঝুঁকি কমবে না। এখন থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, মিরসরাইয়ের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল নজরদারিরই প্রতিফলন। হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দ্রুত পাইপলাইনকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করা এবং দায় নির্ধারণে কোনো ছাড় না দেওয়া।