শূন্য হাতে শুরু, মোস্তাফিজুরের এখন বছরে আয় ১০ লাখ টাকা
শূন্য হাতে নার্সারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মোস্তফা। এখন তিনি বছরে আয় করেন অন্তত ১০ লাখ টাকা। বর্তমান অবস্থানে আসার পেছনে আছে তাঁর ২৮ বছরের পরিশ্রম। তাঁর নার্সারিতে এখন দেশি-বিদেশি ৭০ থেকে ৮০ প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি ফুলের চারা আছে। মোস্তাফিজুরের সাফল্য দেখে অনেকে এ কাজে আগ্রহী হচ্ছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান গফরগাঁও উপজেলার সালটিয়া ইউনিয়নের রৌহা গ্রামের কৃষক জনাব আলীর ছেলে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে চতুর্থ তিনি। ১৯৯৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। শুরুতে পানের বরজে পান চাষ করেন। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর নতুন সংসারে আয় বাড়াতে করেছিলেন সবজির আবাদ। কিন্তু বেশি লাভজনক না হওয়ায় ১৯৯৮ সালে নার্সারি ব্যবসা শুরু করেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রথমে দুই বন্ধুকে নিয়ে নার্সারি শুরু করেন। এক বন্ধু জমি দেন, অন্যজন বিনিয়োগ করেন। শ্রম দিয়ে দেখাশোনা করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। বছরখানেকের মধ্যে তিন বন্ধুর ঐক্যে ফাটল ধরে। এক বছরের আয় থেকে তিনি সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাগ পান। ১৯৯৯ সালে এক বন্ধুকে বাদ দিয়ে বাকি দুই বন্ধু যৌথভাবে ১০০ শতাংশ জমি নিয়ে নতুন করে নার্সারি করেন। কিন্তু সেটিও এক বছর টেকেনি। একপর্যায়ে ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বলেন, ‘নার্সারি করতে গিয়ে জীবন থেকে দুই বছর সময় নষ্ট হয়ে যায়। এতে মনে জেদ চেপে যায়। এই নার্সারি থেকে কীভাবে উন্নতি করা যায়, সেটা চিন্তা করতে থাকি। ২০০১ সালে একাই ৪৩ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে নার্সারি শুরু করি।’
মোস্তাফিজুরের নার্সারির নাম ‘চির সবুজ নার্সারি’। গফরগাঁও-ময়মনসিংহ সড়কের সালটিয়া ও বারবাড়িয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সুবর্ণপুর ও রৌহা গ্রাম ঘেঁষে তাঁর নার্সারি। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা সড়কের পাশে নার্সারিটি বেশ গোছানো। অনেকে নার্সারি দেখতে আসেন, গাছ কেনেন ও ছবি তোলেন। শূন্য হাতে শুরু করলেও এখন তিনটি নার্সারির মালিক মোস্তাফিজুর। ১৬১ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে তিনটি পৃথক স্থানে নার্সারি করেছেন। মোস্তাফিজুরের দুই ছেলের একজন সৌদিপ্রবাসী ও অন্যজন দিদারুল ইসলাম বাবার নার্সারি দেখাশোনা করেন। দিদারুল বলেন, ‘গাছ নিয়ে কাজ করার মধ্যে যে আনন্দ পাই, তা আর কিছুতে নেই।’
মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় আমার ঘরে খাবার ছিল না। অনেক কষ্টের মধ্যে আমি ব্যবসাটা শুরু করেছি। আমার পরিবার, স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কেউ সহযোগিতা করবে, এমন কাউকে পাইনি। অনেক কষ্টের পর আস্তে আস্তে এই ব্যবসা শুরু করি। এখন আমার নার্সারিতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চারা আছে। বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের চারা আছে। ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা মূল্যের গাছ আছে।’ তিনি বলেন, নার্সারি থেকে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। নিয়মিত ৫ থেকে ৭ জন শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকের মজুরি, জমির ভাড়া, চারা উৎপাদন ও নিজের সংসার খরচসহ আনুষঙ্গিক খরচ করেও বছরে ১০ লাখ টাকা আয় থাকে। কিন্তু যখন শুরু করেছিলেন, তখন কোনো পুঁজি ছিল না।
গফরগাঁও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাকুরা নাম্নী প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলায় ২২টি নিবন্ধিত নার্সারি আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো নার্সারির মালিক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি পরিশ্রমী ও সফল। তাঁকে দেখে আরও অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি বলেন, নার্সারির জন্য একটি পলিনেট হাউসের দাবি জানালেও বর্তমানে এ ধরনের কোনো প্রকল্প না থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না। তবে সুযোগ তৈরি হলে তাঁকে পলিনেট হাউস দেওয়া হবে।