স্কুলে ছিলেন সেরাদের একজন, মানসিক সমস্যায় শিকলে বন্দিজীবন হাসানের

অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে না পারায় এভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে হাসান সরকারকে। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেরা শিক্ষার্থীদের একজন ছিলেন হাসান সরকার। স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হবেন। তবে তার আগেই শারীরিক–মানসিক অসুস্থতায় থমকে যায় জীবন। শিকলে বাঁধা পড়েন তিনি। দারিদ্র্যের কারণে যথাযথ চিকিৎসাও পাননি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর অসুস্থতা।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে হাসান সরকারের বাড়ি। বাবা মোবারক হোসেনের নিজের কোনো জমিজমা ছিল না। ছোট একটি ভাতের হোটেল চালিয়েই তাঁর সংসার চলত। দুই ভাই ও দুই বোনের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৪.৭৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন হাসান। ভর্তি হন রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। এর কিছুদিন পরই তাঁর মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ধারদেনার পাশাপাশি সহায়-সম্বল বিক্রি করে চলতে থাকে তাঁর চিকিৎসা। তবে একসময় বাবা–মা আর পারেননি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে।

২০২০ সালের এপ্রিল মাসে মা জাহানারা বেগম এবং ২০২২ সালের মে মাসে বাবা মোবারক হোসেন মারা যান। এরপর পুরোপুরি থেমে যায় হাসানের চিকিৎসা। এতে তাঁর অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একসময় তিনি প্রতিবেশীদের  মারধর করতে শুরু করেন। নিরাপত্তার কথা ভেবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার।

সম্প্রতি দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মাটির মেঝেতে বসে আছেন হাসান। পায়ে লোহার শিকল। বসে বসে পলিথিনে রাখা মুড়ি চিবুচ্ছেন তিনি। দীর্ঘদিন চুল-দাড়ি না কাটায় জট বেঁধেছে। হাত-পায়ের নখ বড় হয়েছে। মাটিতে দীর্ঘ সময় ধরে শুয়ে-বসে থেকে শরীরে ঘা তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে মৃদু স্বরে কিছু বলছেন, আবার চুপ করে তাকিয়ে দেখছেন শূন্যে।

হাসানের ভাগনি শামীমা আক্তার বলেন, ‘নানা-নানি মারা যাওয়ার পর টাকার অভাবে মামার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাঁর পাগলামো বাড়তে থাকে, মানুষজন ভয় পেতে শুরু করে। উপায় না পেয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। তিন বছর ধরে এভাবেই আছেন।’

স্কুলজীবনে হাসান সেরা শিক্ষার্থী ছিলেন জানিয়ে তাঁর সহপাঠী আবদুল মতিন বলেন, তাঁকে এই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট লাগে। সমাজের বিত্তবান মানুষ বা প্রশাসন এগিয়ে এলে হয়তো ও আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান বলেন, হাসানের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁর নামে প্রতিবন্ধী ভাতা করে দেওয়া হয়েছে।

হাসানকে সহযোগিতা করার পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোনাব্বর হোসেন।