বর্ষায় জলের ক্যানভাসে কাউয়াদীঘি হাওর

শেষ বিকেলের রঙিন আলোয় হাওরের রূপ। রোববার বিকেলে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরেছবি: প্রথম আলো

বর্ষার জলে টইটুম্বুর হাওরের বুক। বর্ষায় জলই হাওরের প্রাণ। যেদিকে চোখ যায়—জলের বৈভব, ঢেউ। এদিক-ওদিক ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু ছোট নৌকা। দু–একটিতে সাদা-নীল পাল উড়ছে। বেশির ভাগই মাছ ধরার নৌকা। মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর এখন নিভৃতে, নীরবে তার এমন রূপ মেলে ধরেছে।

রোববারের বিকেলটি হঠাৎ মেঘলা হয়ে ওঠে। এই বুঝি ঝড় উঠবে, বৃষ্টি নামবে। এমন দিনে মৌলভীবাজার শহর থেকে উত্তরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরের কাদিপুর, অন্তেহরি গ্রামের কাছে পৌঁছালে পুরো হাওরটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখানে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পথঘাট ভেজা। কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রামগুলো বর্ষায় ‘হাওরকন্যা’ হয়ে ওঠে। এখানে আসতে হয় দুই পা জলে ডুবিয়ে, নয়তো নৌকায়।

কাদিপুর অটোরিকশা স্ট্যান্ডে আসার পরই দেখা গেল, একজন মাঝি নৌকা নিয়ে বসে আছেন। অনেক বাড়িতে যেতে এই নৌকাই ভরসা। আবার অনেকে হাওরে ঘুরতে এলে এই নৌকাগুলোই হাঁসের মতো জলের বুকে যাত্রী নিয়ে ভেসে যায়, ঢেউয়ে দুলতে দুলতে এদিক-ওদিক ঘোরে। কোথাও ঘন মেঘ ও গাছপালার ছায়া পড়েছে জলে। এমনই তো হয় মেঘ-বৃষ্টির আষাঢ় মাসে। তখন দারুণ এক ঘোর লাগা বিকেল। মেঘের ছায়া জমে আছে হিজল-করচের ঝোপে। অনেক দূরের গ্রামগুলো মেঘের নিচে পটে আঁকা কালচে সবুজ রেখা।

মেঘে ঢাকা হাওরের আকাশ। রোববার বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরপারের কাদিপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

অনেক নৌকা গ্রামের ছোট খাল পেরিয়ে হাওরের দিকে ছুটছে, কোনোটি ফিরে আসছে হাওর থেকে। কেউ ছুটছেন মাছ ধরতে, কেউ মাছ ধরে ফিরছেন। এটিই এখন হাওরের চেনা রূপ। কিছু মানুষের এখন নৌকাই টিকে থাকার অবলম্বন। হাওরের বুকেই কাটে তাঁদের দিন–রাতের বেশির ভাগ সময়। পুঁটি, মলা, ট্যাংরা, চিংড়িসহ ছোট জাতের মাছ ধরা পড়ে তাঁদের জালে। সেসব মাছ ধরে বিক্রি করে যে দুই পয়সা আসে, তা দিয়েই চলে কারও কারও জীবিকা।

স্কুলপড়ুয়া এক কিশোর নৌকা নিয়ে জলে ভাসছে। সে জানাল, মাছ ধরতে যাবে; তবে বিক্রি নয়, খাওয়ার জন্য। পুব আকাশে একফালি রংধনু অল্প সময়ের জন্য ভেসে উঠে আবার হারিয়ে যায়। অনেকে শেষবেলার কাজ শেষ করতে নৌকা নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন। কেউ নৌকায় গবাদিপশু নিয়ে ঘরে ফিরছেন। কাদিপুর কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক মানুষের জটলা, তাঁরা সবাই দিনের সব কাজ গুছিয়ে সময় কাটাতে একত্র হয়েছেন। হাওরে মাছ ধরা থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল—আলাপে অনেক কিছুই উঠে আসে।

হাওরে ভেসে বেড়াচ্ছে হাঁসের ঝাঁক। রোববার বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরে
ছবি: প্রথম আলো

হাওরের অনন্য রূপের পাশাপাশি কিছু বেদনাও রয়েছে। এবার হঠাৎ আসা ঢলের পানিতে অনেকের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। তাঁদের কথায় সেই হারানোর হাহাকার ছিল। তবু এই হাওর, চেনা মাঠ, চেনা ঘাট—এই নিয়েই তাঁদের জীবন। হারানোর কষ্ট ভুলেই অনেকে বর্ষায় অন্তেহরিসহ আশপাশের গ্রামের সৌন্দর্যের কথা বলেন।

আকাশে রংধনু। রোববার বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরে
ছবি: প্রথম আলো

কাদিপুর গ্রামের গৌরা নমশূদ্র, জুমাপুরের মো. লকনু মিয়া ও ব্যবসায়ী আবদুল মুহিত জানান, বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাউয়াদীঘি হাওর জলে ভরা থাকে। বর্ষার এ সময়টিতে হাওরপারের প্রায় বাড়িতেই পানি ওঠে, রাস্তাঘাট ডুবে যায়। বাড়িঘর থেকে নৌকা ছাড়া বের হওয়ার উপায় থাকে না। জলের গ্রাম অন্তেহরিসহ বিভিন্ন গ্রামের অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের নিজের নৌকা নেই। বর্ষায় তাঁরা চলাফেরা করতে, গরু-বাছুরের ঘাস সংগ্রহ করতে নৌকা ভাড়া করেন। একটি নৌকার ভাড়া মাসে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা। এত কিছু সত্ত্বেও এখানে কোনো কিছু থেমে থাকে না।

হাওরে মাছ ধরা শেষে নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন জেলে। রোববার বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরে
ছবি: প্রথম আলো

সন্ধ্যা নেমে আসছে মন্থরগতিতে। গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন গেরস্ত। কাকের ঝাঁক আকাশে কালো চিহ্ন এঁকে বাসায় ফিরছে। দু–একটি সাদা বক ও চিল উড়ছে। হাওর থেকে নৌকা নিয়ে ফিরছেন অনেকে। কচুরিপানা ঠেলে ঠেলে নৌকা পাড়ে ভিড়ছে। পশ্চিমের আকাশে সূর্যের রং মেঘের গায়ে লেগেছে। দিনের শেষমুহূর্তটি তখন হাওরের রূপে কাতর হয়ে উঠেছে।