পূজার ছুটিতে পাহাড়–ঝরনায় যেতে চান, খাগড়াছড়ির যেসব জায়গা হতে পারে গন্তব্য

খাগড়াছড়ি শহর ও আশপাশে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র ও গুহা, রিছাং ঝরনা, দেবতা পুকুর, হাতিমাথা সিঁড়ি, পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক ও মায়াবিনী লেক উল্লেখযোগ্য। কোনোটি রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণকারীদের জন্য, আবার কোনোটি পরিবার নিয়ে অবসর কাটানোর উপযোগী।

জেলা পরিষদ পার্কের জিপ লাইনছবি: প্রথম আলো

দুর্গাপূজার ছুটিতে পাহাড়, ঝরনা ও হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান অনেকেই। তাঁদের জন্য সঠিক গন্তব্য হতে পারে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। আঁকাবাঁকা পথ, সবুজের সমারোহ, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা আর বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জনপদ—সব মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে এই জেলা।

খাগড়াছড়ি শহর ও আশপাশে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র ও গুহা, রিছাং ঝরনা, দেবতা পুকুর, হাতিমাথা সিঁড়ি, পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক ও মায়াবিনী লেক উল্লেখযোগ্য। এর কোনোটি রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণকারীদের জন্য, আবার কোনোটি পরিবার নিয়ে অবসর কাটানোর উপযোগী।

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র

খাগড়াছড়ি শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে আলুটিলা পাহাড়ে অবস্থিত আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র। উঁচু পাহাড়, সাজানো হাঁটাপথ, সিঁড়ি ও ঝুলন্ত সেতুর কারণে জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। পাহাড়ের ওপর থেকে খাগড়াছড়ি শহর ও আশপাশের পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

আলুটিলার অন্যতম আকর্ষণ প্রাকৃতিক গুহা। স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘মাতাই হাকর’ বা ‘দেবতার গুহা’ নামে পরিচিত। গুহায় পৌঁছাতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে হয়। এরপর অন্ধকার, পাথুরে ও স্যাঁতসেঁতে পথ ধরে গুহার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ভ্রমণে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে।

তবে গুহার ভেতরে আলো কম থাকায় সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। জুতা, আলো ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে গুহায় প্রবেশ করা উচিত। খাগড়াছড়ি শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয় পরিবহন অথবা ভাড়া করা জিপে আলুটিলা যাওয়া যায়। শহর থেকে সড়কপথে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ।

খাগড়াছড়ির হাতিমাথা সিঁড়ি
ফাইল ছবি

রিছাং ঝরনা

আলুটিলা ঘুরে একই ভ্রমণে ঘুরে আসতে পারেন রিছাং ঝরনা। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঝরনা খাগড়াছড়ির অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক আকর্ষণ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা, চারপাশের সবুজ গাছপালা, জুমঘর ও আঁকাবাঁকা পথ—সব মিলিয়ে ঝরনায় যাওয়ার যাত্রাটি উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

মূল সড়ক থেকে ঝরনার দিকে এগোলে চোখে পড়ে পাহাড়ি প্রকৃতির বৈচিত্র্য। পথের দুই পাশে সবুজ পাহাড়, ঝোপঝাড় ও বুনো ফুলের দেখা মেলে। ঝরনার কাছে পৌঁছালে পানির কলতান আর পাহাড়ের নীরব পরিবেশে মন প্রশান্ত হয় অনেকের।

রিছাং ঝরনার কাছাকাছি আরেকটি ছোট ঝরনাও রয়েছে। এটি ভ্রমণে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে। তবে পানির প্রবাহ, ঋতু ও বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে এর সৌন্দর্য পরিবর্তিত হয়।

খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাটিরাঙ্গাগামী সড়ক ধরে রিছাং ঝরনার পথে যাওয়া যায়। স্থানীয় বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল বা ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার করে সেখানে পৌঁছানো যায়। মূল সড়ক থেকে ঝরনায় পৌঁছাতে কিছুটা পথ হাঁটতে হয়।

দেবতা পুকুর

পাহাড়ের অনেকটা ওপরে অবস্থিত দেবতা পুকুর খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। জেলার নুনছড়ি এলাকার ত্রিপুরা পাড়ায় অবস্থিত এই পুকুর স্থানীয়ভাবে ‘মাতাই পুখিরি’ নামেও পরিচিত। ত্রিপুরা ভাষায় এর অর্থ দেবতা পুকুর। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য দেবতা এই পুকুর খনন করেছিলেন।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত পুকুরটিতে পৌঁছানোর পথটিও বেশ বৈচিত্র্যময়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে ত্রিপুরা পাড়ায় পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে গাছপালায় ছায়াঘেরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে পুকুরের কাছে পৌঁছালে চারপাশের সবুজ পাহাড়, পাখির ডাক ও নিরিবিলি পরিবেশে মুগ্ধ হন না—এমন ভ্রমণকারী পাওয়া মুশকিল।

তবে দেবতা পুকুরে ভ্রমণের জন্য শারীরিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে প্রায় ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। যদিও হাঁটার গতি ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর সময় নির্ভর করে। এখানে যেতে সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি, আরামদায়ক জুতা পরা ও প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নেওয়া উচিত।

খাগড়াছড়ি শহর থেকে খাগড়াছড়ি–মহালছড়ি সড়ক ধরে মাইসছড়ি হয়ে নুনছড়ি এলাকায় যেতে হয়। এরপর পাহাড়ি পথ ও সিঁড়ি বেয়ে পুকুরে পৌঁছাতে হয়। গাড়ি সাধারণত ত্রিপুরা পাড়ার কাছাকাছি পর্যন্ত নেওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পথনির্দেশনা নিয়ে এতে যাওয়া ভালো।

আলুটিলা গুহা
ফাইল ছবি

হাতিমাথা সিঁড়ি

যাঁরা পাহাড়ি পথে হাঁটতে ও শারীরিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি উপভোগ করতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য হাতিমাথা সিঁড়ি হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। হাতিমুড়া বা মায়ুং কপাল নামেও এটি পরিচিত।

এই এলাকার পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তৈরি সিঁড়ির ধাপ ধরে এগোতে হয় একের পর এক। পথে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়, গাছপালা ও আশপাশের জনপদ। তবে জায়গাটির প্রধান আকর্ষণ শুধু দৃশ্য নয়। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ওপরে ওঠাও উপভোগ করেন অনেকে।

এই ভ্রমণে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও হাঁটাচলায় অসুবিধা রয়েছে—এমন ভ্রমণকারীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এ সময় সঙ্গে পানি রাখা, আরামদায়ক জুতা পরা ও ক্লান্ত লাগলে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিতে হবে। বৃষ্টি হলে সিঁড়ি পিচ্ছিল হতে পারে। এটি মাথায় রেখে পা ফেলতে হবে। খাগড়াছড়ি–পানছড়ি সড়কের পেরাছড়া এলাকা পর্যন্ত গাড়িতে যেতে হয়। চেঙ্গী নদী পার হয়ে এরপর চার কিলোমিটার হেঁটে এ সিঁড়িতে যেতে হয়।

হর্টিকালচার পার্ক

দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হাঁটার পরিকল্পনা না থাকলে ভ্রমণের তালিকায় রাখতে পারেন পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক। সবুজ গাছপালা ও সাজানো পরিবেশে পরিবার–পরিজন নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প। এখানে রয়েছে ‘জায়ান্ট সুইং’, ‘জিপ লাইন’ ও শিশুদের জন্য কিডস জোন।

শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করলে কিংবা পাহাড়ি পথে দীর্ঘ সময় হাঁটার পর বিশ্রাম নিতে চাইলে জায়গাটি পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে। খাগড়াছড়ি শহর থেকে অটোরিকশা বা নিজস্ব পরিবহনে পার্কে যাওয়া যায়।

মায়াবিনী লেক

পাহাড়ের মধ্যে সবুজে ঘেরা মায়াবিনী লেক পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী স্কয়ার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পানছড়ি উপজেলার লতিবান ইউনিয়নের কংচাইরি পাড়া এলাকায় এর অবস্থান।

দুই পাহাড়ের মাঝখানে বাঁধ দিয়ে তৈরি এই হ্রদ ঘিরে গড়ে উঠেছে বিনোদনকেন্দ্র। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি ও ছবি তোলার জন্য এটি উপযোগী। লেককেন্দ্রিক বিনোদনের পাশাপাশি এখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থাও রয়েছে।

খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর থেকে পানছড়ি সড়ক ধরে ভাইবোনছড়া বাজারের দিকে যেতে হয়। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে কংচাইরি পাড়ায় মায়াবিনী লেক অবস্থিত। স্থানীয় অটোরিকশা, মাহিন্দ্রা বা ভাড়া করা গাড়িতে এখানে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

খাগড়াছড়ি শহরে পর্যটন মোটেল, হোটেল গাইরিং, অরণ্য বিলাস, মাউন্টেন, শৈল সুবর্ণসহ বিভিন্ন মানের থাকার হোটেল আছে। সেখান থেকে নিজেদের বাজেটের মধ্যে হোটেল বা মোটেল খুঁজে নিতে হবে। এসব হোটেলের ভাড়া ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।