প্রায় ৩০০ বর্গফুট আয়তনের ছোট্ট একটি ওয়ার্ডে দুই সারিতে গাদাগাদি করে বসানো আছে আটটি শয্যা। প্রতিটি শয্যায় তিন থেকে চারজন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর চিকিৎসা চলছে। প্রত্যেক শিশুর সঙ্গে কয়েকজন করে পরিবারের সদস্যও থাকছেন। চিকিৎসক-নার্স এবং দর্শনার্থীর ভিড়ে ছোট শিশু ওয়ার্ডের হাম কর্নারের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে।
আজ বুধবার দুপুরে ২৫০ শয্যার সরকারি কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের হাম কর্নারে গিয়ে রোগীর ভিড় দেখা গেছে। আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হাম কর্নারে হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে মহেশখালীর সাত মাস বয়সী শিশু হিরামণি। আগের দিন মঙ্গলবার রাতে মারা যায় বেবী নামে ৯ মাস বয়সী রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির আরেক শিশু। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভর্তি থাকা রোগীদের স্বজনেরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
হাসপাতালের তৃতীয় তলার শিশু ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশে পৃথকভাবে হাম কর্নার করা হয়েছে। সেখানে ৮টি শয্যায় ৩৪ শিশু ভর্তি আছে। এসব শিশুর ৯০ শতাংশের বয়স এক বছরের নিচে। বেশির ভাগ শিশুর বাড়ি সাগরদ্বীপ মহেশখালী, রামুর মিঠাছড়ি, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ির বাইশারী এলাকায়।
এক শয্যায় চার শিশুর চিকিৎসা
হাম কর্নারের ২২ নম্বর শয্যায় একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে চার শিশুকে। এরা হলো ৭ মাসের রায়হান, ১৩ মাসের নুরে জান্নাত, ৫ মাসের সিদরাতুল মুনতাহা ও ৯ মাসের মো. শামা। শয্যার পাশে বসে সন্তানদের দেখভাল করছেন চার শিশুর মা। দুই শিশুর বাবা পাশে দাঁড়িয়ে সন্তানের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।
রায়হানের বাড়ি মহেশখালীর হোয়ানক এলাকায়। শিশুটির মা সাজিয়া বেগম (৩০) প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ দিন ধরে ছেলের সর্দি-জ্বর। প্রথমে মহেশখালী হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করা হয়। সেখানে সর্দি কাশির ওষুধ খাওয়ানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে গত মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে হামের উপসর্গ শনাক্ত করেন। দুই দিন ধরে চিকিৎসা চলছে এখানে। তবে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। জন্মের পর সন্তানকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে জানান সাজিয়া বেগম।
নুরে জান্নাতের বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সমুদ্র উপকূলীয় কলাতলী এলাকায়। মা সালমা বেগম (৩৪) প্রথম আলোকে বলেন, ছয় দিন আগে মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়। গতকাল হাসপাতালে আনার পর হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। বাবা নুরুল হক বলেন, চার মাস আগে নুরে জান্নাতকে টিকা দেওয়া হয়েছিল, সেটি হামের টিকা কি না, তা তাঁর জানা নেই।
সিদরাতুল মুনতাহার বাড়ি রামুর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের কলঘর এলাকায়। মা সাকিয়া জান্নাত বলেন, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে প্রথমে পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে জ্বরের সিরাপ খাওয়ানো হয়। অবস্থার উন্নতি না হলে গত ২৬ মার্চ এই হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষার পর হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। সাত দিন ধরে চার শিশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে রেখে তাঁর মেয়েরও চিকিৎসা চলছে। সাকিয়া জান্নাত বলেন, ‘পর পর দুই শিশু মারা গেল। সুস্থ সন্তান নিয়ে কখন বাড়ি ফিরতে পারব জানি না।’
৯ মাস বয়সী শিশু মো. শামার বাড়ি কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী এলাকায়। জ্বর হলে চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষায় হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। শিশুর মা রাহেলা আক্তার বলেন, আট দিন ধরে তাঁর সন্তানের চিকিৎসা চলছে। এক শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলে বেডে (শয্যা) আরেক শিশু এসে যুক্ত হয়। প্রতিদিন তিন-চারজন শিশুকে এক বেডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিকল্প উপায়ও হাসপাতালে নেই।
যমজ সন্তান নিয়ে উদ্বিগ্ন মরিয়ম
হাম কর্নারের ২৭ নম্বর বেডেও গাদাগাদি করে রাখা হয় চার শিশুকে। এর মধ্যে দুই যমজ শিশুসন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন মা মরিয়ম বেগম। পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন স্বামী আলী জুহার। তাঁদের বাড়ি রামুর মিঠাছড়ি এলাকায়।
সাত ঘণ্টার ব্যবধানে জন্ম নেওয়া দুই যমজ ভাইবোন রুশ্নি ও রাবেয়ার বয়স সাত মাস। মরিয়ম বেগম (৪০) বলেন, ঈদের তিন দিন আগে রুশ্নির প্রথম সর্দি-কাশি শুরু হয়। এক দিন পর জ্বর ওঠে রাবেয়ারও। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে দুজনকে জ্বরের ওষুধ খাওয়ানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে ২২ মার্চ এই হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষার পর দুই ভাইবোনের হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। সেই থেকে টানা ১০ দিন এই ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে। এখন কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। একই শয্যায় মহেশখালী ও রামু থেকে আসা অপর দুই শিশুর চিকিৎসা চলছে তিন দিন ধরে। হাম উপসর্গের পাশাপাশি দুই শিশু নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত।
আরেকটি শয্যায় তিন শিশুর চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে ৯ মাস বয়সী শিশু রাফসান আল আরিশের বাড়ি চকরিয়ার খুটাখালী এলাকায়। দুপুরে পরীক্ষার জন্য রাফসানকে কোলে করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাবা রোস্তম সাঈয়েদ। তিনি বলেন, ‘জ্বর-কাশি ছিল কয়েক দিন, গতকাল এই হাসপাতালে আনার পর হাম উপসর্গ ধরা পড়েছে। সন্তান নিয়ে টেনশনে আছি।’
আজ সকাল সাড়ে নয়টায় এই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে হিরামণি নামের সাত মাস বয়সের এক শিশু। সে মহেশখালীর সরওয়ার কামালের মেয়ে। হাম উপসর্গ নিয়ে গত ৩০ মার্চ ভর্তি করা হয়েছিল। আগের দিন রাতে মারা গেছে আরেক শিশু। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওয়ার্ডের অন্যান্য রোগীর স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ইনচার্জ ও সহকারী রেজিস্ট্রার শহিদুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যু হওয়া দুই শিশুর নিউমোনিয়া ও হার্টের সমস্যা ছিল। মুখে খেতে পারছিল না, নাক দিয়ে খাবার খাওয়ানো হচ্ছিল।
রোগীর চাপ বেশি বলে এক শয্যায় তিন-চারজন করে শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে জানিয়ে শহিদুল আলম বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। ভিটামিন ‘এ’–এর অভাবেই এক বছরের কম বয়সের শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিন ঞো প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে, জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। মহেশখালী, কক্সবাজার পৌরসভা, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও সংক্রমণ রোগবিশেষজ্ঞ মো. শাহজাহান নাজির বলেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটি এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণত পাঁচ বছরের নিচের শিশু, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। উদ্বেগের বিষয় হলো অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সের শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। শাহজাহান নাজির বলেন, যেসব এলাকার টিকা নেওয়ার হার ৮৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।