সাহিদুল আলাপে আলাপে বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে তাঁর বাবা পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলা থেকে খুলনা এসে খাবার হোটেলের ব্যবসা শুরু করেন। শহরের ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে সেই হোটেলের নাম ছিল ‘হোসেন সুইটস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। ছোটবেলা থেকেই সমুচার সঙ্গে তাঁর সখ্য। সপ্তম শ্রেণির পর সাহিদুলের পড়ার পাট চুকে যায়। বাবার সঙ্গে হোটেলের কাজে যোগ দেন। ইকবালনগর স্কুলের বাচ্চাদের কাছে সমুচা বিক্রি করতেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ব্যবসার হাল ধরেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালের দিকে স্কুলটি সরকারি হয়ে যায়।

default-image

সাহিদুল বলেন, স্কুল সরকারি হওয়ার কিছুদিন পর ঘোষণা এল যে বাইরের খাবার শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করা যাবে না। তখন বেচাবিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। দেনা হতে শুরু করে। দেনায় জর্জরিত হয়ে একসময় দোকানটা ছেড়ে দিতে হয়। এরপর সংসার চালাতে তিনি বেছে নেন রাজমিস্ত্রির কাজ, রঙের কাজসহ হরেক কিসিমের কাজ। তবে বাচ্চাদের কাছে টিফিন বিক্রিতে যে ভালো লাগা, সেটা ভুলতে পারতেন না। অন্য কাজে মন বসত না। বুঝতে পারেন, অন্য কাজ তাঁকে দিয়ে হবে না।

পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আধা কাঠার বাড়িতেই সমুচা তৈরির ব্যবসা শুরুর কথা ভাবেন সাহিদুল। নাম ঠিক করেন ‘স্টুডেন্ট সমুচা’। এ রকম নাম কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে বিক্রির সময় হাঁক দিয়ে বলতাম, এই স্টুডেন্ট, সমুচা, সমুচা! বাচ্চারা এসে বলত, আঙ্কেল, আমাকে স্টুডেন্ট সমুচা দেন। এভাবেই নাম।’

২০১৬ সালে নতুন করে শুরুর দিকে সাহিদুল অল্প কিছু সমুচা বালতিতে ভরে সকালে বিভিন্ন স্কুলের সামনে বিক্রি করতেন। বিকেলে যেতেন বড়বাজারে। আস্তে আস্তে নাম ছড়াতে থাকল। বিক্রি বাড়তে থাকায় একজন কর্মচারী রাখলেন। পরে আয় বুঝে আস্তে আস্তে কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ালেন।

এই সমুচার বিশেষ দিক নিয়ে সাহিদুলের ভাষ্য, ‘ছোট ছোট করে বানাই। বাচ্চাদের দেখে ভালো লাগে। ১০ টাকায় তো কিছু পাওয়া যায় না। বাচ্চারা ১০ টাকায় তিন থেকে চারটা সমুচা পায়, তাতেই খুশি। বড়রাও পছন্দ করছে। এ ছাড়া কোনো পোড়া তেল ব্যবহার করি না। বাজারের সবচেয়ে ভালো ময়দা, ভালো পেঁয়াজ ব্যবহার করি।’ সাহিদুল জানান, করোনার সময় তাঁর ব্যবসায় খুব একটা ভাটা পড়েনি। অর্ডার দিয়ে লোকে তাঁর সমুচা নিয়েছেন। তবে বিধিনিষেধের কারণে ফেরি করে বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়।

সাহিদুল বলেন, করোনার প্রকোপ কিছুটা কমে আসার পর বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। অভাব–অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠত। কেউ হকার ছিলেন, কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, কেউ শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের কাজ নেই, চাকরি নেই। এমন ২০ জনকে নিয়ে একটি দল হলো। ১০ জন সমুচা তৈরি করেন, বাকিরা বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে প্রতি দিন ৫ থেকে ৭ হাজার সমুচা বিক্রি হয়।

স্টুডেন্ট সমুচা যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের একজন পদ্মা রানী দাস। শহরের একটা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করতেন। স্বামীর সেলুনের দোকান ছিল। করোনার সময় স্কুল আর সেলুন বন্ধ হয়ে গেলে ভীষণ বিপাকে পড়ে যায় পরিবারটি। তিনি বলেন, ‘বিপদের দিনে পাশে পেয়েছিলাম প্রতিবেশী সাহিদুল ভাইকে। তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করতে বলেন। এখন ঘরে বসে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার সমুচা তৈরি করি। বাচ্চাকে স্কুলে দেওয়া-নেওয়া করে ঘরে বসে আয় করতে পেরে খুবই ভালো আছি। এ জন্য স্কুলে আর যোগ দিইনি।’

আগের দিন ফোন করে হকারদের কাছ থেকে সমুচার অর্ডার নেন সাহিদুল। সেই অনুযায়ী সমুচা তৈরি করেন। প্রতিষ্ঠান থেকে হকাররা ১০ টাকায় চারটি সমুচা পান। তাঁরা ক্রেতাদের কাছে ১০ টাকায় তিনটা করে বিক্রি করেন। বিক্রেতাদের প্রতিটি সমুচায় ৮৩ পয়সা থাকে। তবে এখান থেকে তাঁদের প্যাকেট করা খরচসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিতে হয়। সাহিদুল ও তাঁর নিজস্ব কর্মচারী সমুচার খামিরের রুটি ও পেঁয়াজের কিমার পুর তৈরি ও ভাজার কাজ করেন। রুটির মধ্যে পুর ঢুকিয়ে ঘরে বসে প্যাঁচানোর কাজ করেন পদ্মা রানীর মতো কয়েকজন। প্যাঁচানোর জন্য ১০০ পিসে তাঁরা কমিশন পান ১২ থেকে ১৪ টাকা করে।

সাহিদুল বলেন, ‘সকালে ও বিকেলে দুবার সমুচা তৈরি করি। আমার এখানে কোনো ইনভেস্ট নেই। মুদিদোকান থেকে উপকরণ বাকিতে কিনি। বিক্রিবাট্টা করে পরের দিন টাকা পরিশোধ করি। সাইকেল, হ্যান্ডমাইক—সব হকারদের। ফেরি করে সমুচা বিক্রি করা একটা পরিবারের যেন প্রতিদিন কম করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়, সেই ব্যবস্থা করে মাল তৈরি করি। আর ঘরে বসে যাঁরা সমুচা প্যাঁচানোর কাজ করেন, তাঁরা প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করতে পারেন। কোনো হকার না আসতে পারলে সেই সমুচা নিজের বিক্রি করতে নামা লাগে। দিনে কখনো হাজারখানেক, কখনো হাজার দেড়েক বা তারও বেশি টাকা আমার থাকছে। সবাই করে খাচ্ছি, এটাই বড় কথা।’

default-image

ভবিষ্যতের ভাবনা সম্পর্কে সাহিদুল বলেন, ‘সুযোগ পেলে অসহায় মানুষকে নিয়ে বড় পরিসরে একটা আউটলেট দেব। সেখানে নানান পদ আর স্বাদের সমুচা থাকবে। পাশাপাশি ফ্রোজেন সমুচা বিদেশে রপ্তানি করারও চেষ্টা চলবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন