ছোট মাছে বড় স্বীকৃতি কীভাবে এল, জানতে চাইলে নুরুল হক ফিরে যান তাঁর তারুণ্যের দিনগুলোতে। ১৯৮৮ সালের কথা। নুরুল হক ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গণিতে স্নাতক (সম্মান) পড়ছিলেন। এ সময় ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় পুকুর করে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। গ্রামের মানুষের কাছে তখন হ্যাচারির রেণুর কদর ছিল না। জামালপুর থেকে যমুনা নদীর রেণু এনে নিজে চাষ করতেন। আশপাশের মানুষ চাইলে রেণু বিক্রি করতেন। নুরুল এখন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় ব্রহ্মপুত্র ফিস ফিড কমপ্লেক্স নামের বিশাল হ্যাচারির মালিক।

মা মলা মাছ সংগ্রহ করে কাজটি সম্পন্ন করা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য ও ধৈর্যের কাজ। কারণ, মলা মাছ ছোট ও সংবেদনশীল হওয়ায় হাতে ধরে ইনজেকশন দিয়ে হরমোন পুশ করে মা মাছকে বাঁচানো খুব কঠিন কাজ। এতে দক্ষ হাতের প্রয়োজন।

১৯৯৩ সালে সদর উপজেলার শম্ভুগঞ্জের চর পুলিয়ামারী গ্রামে গড়ে তোলেন এই হ্যাচারি। প্রথমে রুইজাতীয় মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করলেও মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে শুরু করেন দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির মাগুর ও শিং মাছের পোনা উৎপাদন। এরপর ২০০১ সালে পাবদা, ২০০২ সালে কই, খলশে ও বোয়ালের পোনার বাণিজ্যিক উৎপাদনে সাফল্য পান। মাছগুলো তিনি নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেন।

নুরুল হক গতকাল সোমবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার নেশাই হচ্ছে নতুন কিছু করা। সেই নেশা এখন পেশায় পরিণত হয়েছে। সারা দিন এই হ্যাচারিতেই পড়ে থাকি। ধ্যানজ্ঞান সবই হ্যাচারি নিয়ে।’ মলা মাছের রেণু উৎপাদনে কীভাবে ঝুঁকলেন তার আদ্যোপান্তও জানালেন তিনি।

২০০৫ সালে যখন তিনি কই মাছের প্রথম কৃত্রিম প্রজনন করেন, তখন মৎস্যবিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুল ওহাব তাঁর হ্যাচারিতে আসতেন এবং কৌতূহল নিয়ে তাঁর কাজ দেখতেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তখন তিনি মলা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি প্রায়ই মলার রেণু উৎপাদনে হাত দিতে নুরুলকে অনুরোধ করতেন। এমনকি মলার ব্রিডিং প্রযুক্তি সংযোজনের কথাও বলতেন।

এ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা জাগলেও মলা খুবই সংবেদনশীল মাছ হওয়ায় তিনি পিছিয়ে যেতেন। মাছটির প্রজনন কষ্টসাধ্য হওয়ায় হাত দিতে সময় নিচ্ছিলেন নুরুল। কিন্তু আবদুল ওহাব বিষয়টি নিয়ে তাঁকে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০১৬ সালে প্রথম এ কাজে হাত দেন নুরুল। মা মলা মাছ সংগ্রহ করে কাজটি সম্পন্ন করা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য ও ধৈর্যের কাজ। কারণ, মলা মাছ ছোট ও সংবেদনশীল হওয়ায় হাতে ধরে ইনজেকশন দিয়ে হরমোন পুশ করে মা মাছকে বাঁচানো খুব কঠিন কাজ। এতে দক্ষ হাতের প্রয়োজন।

প্রথম বছর খুব একটা সাফল্য আসেনি। ২০১৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার উদ্যোগ নিয়ে বেশ সফল হন। প্রায় ২০০ কেজি রেণু উৎপাদন করেন নুরুল। পরের বছর থেকে খামারিরা আগ্রহ নিয়ে মলার রেণু কিনতে আসা শুরু করেন। গত বছর হ্যাচারিতে ৫০০ কেজি মলার রেণু উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন নুরুল। প্রতি কেজি রেণু বিক্রি করেছেন ১০ হাজার টাকায়। চলতি বছর প্রথম ৬ মাসে ২৬৫ কেজি রেণু বিক্রি হয়েছে। এবার রেণু পোনা গতবারের চেয়ে বেশি বিক্রি হবে বলে আশা তাঁর।

মলা মাছ জনপ্রিয়। সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের নেপথ্যে কাজ করা বিজ্ঞানী ও ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ প্রকল্পের টিম লিডার আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, মূলত ৯০ সাল থেকেই মলার পুষ্টিগুণ নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও গবেষণা। এরপর ডেনমার্কের কোপেন হেগেন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শকুন্তলা হরাকসিংহ থিলস্টেড এ কাজে যুক্ত হন। গত বছর শকুন্তলা খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারখ্যাত ‘বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার’ পেয়েছেন।

আসলে গরিব–ধনী সবারই উচিত প্রতিদিন পাতে মলা মাছ রাখা। কারণ, এটা প্রকৃতির আশীর্বাদ। এ রকম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ মাছ আর দ্বিতীয়টি নেই। রাতকানা, খর্বকায়, ওজনহীনতা, হাড়ক্ষয়, নারীদের রক্তশূন্যতা থেকে সুরক্ষা দিতে এ মাছের গুরুত্ব অপরিসীম।

আর এবার জাতীয় পুরস্কার পেলেন নুরুল হক। আসলে গরিব–ধনী সবারই উচিত প্রতিদিন পাতে মলা মাছ রাখা। কারণ, এটা প্রকৃতির আশীর্বাদ। এ রকম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ মাছ আর দ্বিতীয়টি নেই। রাতকানা, খর্বকায়, ওজনহীনতা, হাড়ক্ষয়, নারীদের রক্তশূন্যতা থেকে সুরক্ষা দিতে এ মাছের গুরুত্ব অপরিসীম।

গবেষণার মাধ্যমে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওজনে-আকৃতিতে মলা মাছকে বৃদ্ধি করে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। নুরুল হকের জাতীয় স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে কাজটি অধিকতর তরান্বিত হবে বলে মনে করেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন