‘আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই’

বেলা ১টার দিকে কদমতলী চৌরাস্তার আল বারাকা হাসপাতালের পাশের ওই গ্যাসলাইটার কারখানায় আগুন লাগে। ৪ এপ্রিলছবি: তানভীর আহাম্মেদ

‘আমরা গোলামবাজার এলাকায় থাকি। তিন মাস আগে ছেলে এ কারখানায় কাজে ঢোকে। আজ সকাল আটটার দিকে কাজের উদ্দেশ্যে ছেলে বের হয়। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ নেই। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই।’

আহাজারি করতে করতে বলছিলেন কুলসুম বেগম নামের এক নারী। তাঁর ছেলে নাঈম (১৭) ঢাকার কেরানীগঞ্জের আগুনে পুড়ে যাওয়া আকরাম গ্যাসলাইটার কারখানায় কাজ করে। আজ শনিবার বেলা ১টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের কদমতলী ডিপজল গলি সড়ক এলাকার কারখানাটিতে আগুন লাগে।

অগ্নিকাণ্ডের পর কারখানার ভেতর থেকে পাঁচ শ্রমিকের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একাধিক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কুলসুম বেগমের ছেলে নাঈম।

আরও পড়ুন

কুলসুম বেগমের মতো সন্তানের জন্য কারখানার সামনে অপেক্ষা করছিলেন কাওসার সরদার নামের এক ব্যক্তি। তাঁর ১২ বছর বয়সী মেয়ে মনিরাও এই কারখানায় কাজ করে। কাওসার সরদার বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে আমার মেয়ে কারখানাটিতে কাজ করছিল। প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও সে কাজে যায়। পরে লোকমুখে জানতে পারি এখানে আগুন লেগেছে। তৎক্ষণাৎ এখানে এসে মেয়ের খোঁজ করছি। কিন্তু মেয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।’

গ্যাসলাইটার কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তল্লাশি চালাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। আজ শনিবার বিকেলে কেরানীগঞ্জের কদমতলী ডিপজল গলি সড়ক এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় লোকজন বলেন, কারখানাটিতে ৩৫ থেকে ৪০ জন কাজ করতেন। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর ঠিক কতজন নিখোঁজ আছেন, তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ পর্যন্ত কারখানার ভেতর থেকে পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ শ্রমিকদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

একে একে বের করা হয় পাঁচ শ্রমিকের দগ্ধ মৃতদেহ

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোড়া কারখানার ভেতর থেকে একে একে পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। পরে মৃতদেহগুলো পুলিশের পিকআপভ্যানে রাখা হয়। এরপর লাশগুলো ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সযোগে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে মৃত ব্যক্তিদের নাম–পরিচয় পাওয়া যায়নি। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মৃত ব্যক্তিরা পুরুষ না নারী, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।

পুড়ে যাওয়া কারখানা থেকে বের করে আনা হচ্ছে মরদেহ। ৪ এপ্রিল
ছবি: ফায়ার সার্ভিসের সৌজন্যে

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম (দোলন) বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে আমাদের সাতটি ইউনিট দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে কারখানা থেকে পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।’

‘কারখানাটিতে আগুন লেগেছিল ২ বছর আগেও’

কারখানাটির মালিক কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার বাসিন্দা আকরাম মিয়া। আজ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তিনি পলাতক।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর আগে কারখানাটিতে একবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। পরে প্রশাসন সেটি বন্ধ করে দেয়। মাসখানেক পর ফের তারা কারখানার কার্যক্রম শুরু করে। কারখানাটিতে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। আজ সকালে প্রতিদিনের মতো কারখানার শ্রমিকরা কাজ শুরু করেন। দুপুর দিকে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়। ৪ এপ্রিল
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

ডিপজল গলি এলাকার বাসিন্দা রমিজ মিয়া বলেন, ‘ওপরে টিনশেড আর চারপাশে দেয়াল দিয়ে কারখানাটি তৈরি করা হয়েছে। এর ভেতরেই আটটি গুদাম ছিল। যেখানে গ্যাসলাইটারের কাঁচামাল রাখা হতো।’

আরেক বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাসলাইটার কারখানাটি সম্পূর্ণ অবৈধ। আগুন লাগার পর প্রথমে আমরা নেভানোর চেষ্টা করি। পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।’