শুভাঢ্যা খালের কাজটি মনে রাখার মতো করে করবে সেনাবাহিনী: পরিবেশ উপদেষ্টা

কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও উভয় পাড়ের উন্নয়ন এবং সুরক্ষা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।গতকাল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঝাউবাড়ি সেতু এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, শুভাঢ্যা খালটিকে দখলদারদের থেকে বাঁচাতে পাড় ঢালাই করে যতটুকু সম্ভব হাঁটার পথ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। আজ থেকে কাজ শুরু করা হলে যথাসময়ে কাজটা শেষ হবে। এই খালের কাজটা দেখার ও মনে রাখার মতো করে করবে সেনাবাহিনী।

আজ মঙ্গলবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা খাল–সংলগ্ন ঝাউবাড়ি সেতু এলাকায় শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও উভয় পাড়ের উন্নয়ন এবং সুরক্ষা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এসব কথা বলেন।

পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, এখানে যে ভিডিও ফুটেজ দেখানো হলো, সেখানে এই খালের পানি খুব সুন্দর নীল দেখানো হয়েছে। শুভাঢ্যা খালের পানি নীল করতে হলে কারখানার বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে, পয়োবর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে, গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে  হবে। সে জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে বিশেষভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

এই প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৩১৭ কোটিতে আনা হয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, শুভাঢ্যা খাল আর পানির খাল নেই। এটি প্লাস্টিক ও গার্মেন্টসের ঝুটের খাল হয়ে গেছে। এই খালটি পুনঃখনন ও সুরক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই খালের পাড় ঘেঁষে বড় বড় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তাই খালটি খনন করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ। এই খাল অন্য খালগুলোর মতো নয়। এই খালটা বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের সংযোগস্থল। তাই পরিবেশগত বিবেচনায় এই খালের গুরুত্ব অন্য রকম। এই কাজের জন্য এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণ সহায়তা দরকার।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘যদি এটা আপনারা বর্জন করেন, তাহলে সমস্যা অর্ধেক কমে যাবে। এই খালটা খুব গভীর করে খননকাজ করা হচ্ছে। এখানে কিছুটা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। আর যেন পুনরায় দখল না হয়, সেটা নিশ্চিতকরণে খালের উভয় পাড় ঢালাই করে দেওয়া হবে। এটা না হলে ১০ বছর পরে আপনারাই বলবেন, খালটা আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। তাই কেউ যাতে আর খাল দখল করতে না পারে, সে জন্য খালের পাড় সুরক্ষিত করা হবে।’

শুভাঢ্যা খালের ইতিহাস তুলে ধরে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে আমার জন্ম। এই শুভাঢ্যা খাল দিয়ে নৌকায় করে ঢাকায় যেতাম। এখন আর খালের আগের অবস্থা নেই। ম্যাডাম (সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান) যদি এই খালটি উদ্ধারে উদ্যোগ না নিত, তবে এই খালটি রাস্তা হয়ে যেত। এই খাল উন্নয়নের কাজটা কেরানীগঞ্জ ও সিরাজাদিখানের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই কাজটা যেন খুব ভালোভাবে হয়ে যায়, সে ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, খালটি ওই সময় দেশি মৎস্য আহরণের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। নৌকায় বসে খাল থেকে মাছ ধরা যেত। আশপাশের কৃষিজমিতে এই খালের পানি ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে খালটি বর্জ্য ও পলিথিনে ভরা। খালটি এখন হেঁটে পার হওয়া যায়।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আরও বলেন, খালটি পুনঃখনন ও পরিষ্কারের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হবে, যা জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। জলজ ও জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। ভূমিদস্যুরা যাতে কোনোক্রমেই খাল দখল ও ভরাট করতে না পারে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ভূমিদস্যু ও দখলদারদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা ও আন্তরিকতা বাড়াতে হবে। খাল পুনরুদ্ধার হলে চাষাবাদ, নৌপরিবহন, সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি ও নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এতে এলাকার মানুষের আয়ও বাড়বে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ (ই-ইন-সি) মেজর জেনারেল মু. হাসান-উজ-জামান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ, প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহাদাত হোসেন, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ ও ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান প্রমুখ।  

প্রসঙ্গত, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও উভয় পাড়ের উন্নয়ন এবং সুরক্ষা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করবে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। প্রকল্পে খাল খননের পাশাপাশি পাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।