বরিশালে আদালতে ঢুকে আইনজীবী সমিতির নেতাদের হট্টগোল, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি

বরিশালে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে হট্টগোল হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরেছবি : সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও থেকে নেওয়া

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের জামিন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে হট্টগোল হয়েছে। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা এজলাসে ঢুকে বেঞ্চ ধাক্কাধাক্কি ও চিৎকার করেন। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

আদালত সূত্র ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ওই ঘটনা ঘটে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সিটিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা। এতে তারিখ ও সময় উল্লেখ রয়েছে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার বেলা ২টা ৩৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের দিকে ঘটনার শুরু। এর আগে দুপুরে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন মঞ্জুর করার প্রতিবাদে চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। তাঁরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

১ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ একটি মামলার শুনানি করছিলেন। কোর্ট রেজিস্ট্রার (জিআরও) ও কোর্ট পুলিশের তিনজন কনস্টেবল উপস্থিত ছিলে। শুনানি চলা মামলাটির দুজন আইনজীবী আদালতে কথা বলছিলেন। এর মধ্যে আদালত কক্ষের ভেজানো দরজা খুলে চিৎকার করতে করতে একজন আইনজীবী এজলাসে প্রবেশ করেন। তাঁর পেছনে আরও কয়েকজন আইনজীবী আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন। তাঁরা এজলাসে বসার বেঞ্চগুলো হাত-পা দিয়ে ধাক্কা দিতে থাকেন। একজন আইনজীবী বিচারকের সামনে গিয়ে চিৎকার করে আঙুল তুলে কথা বলেন। তিনি বিচারকের সামনে থাকা একটি বেঞ্চে আঘাত করেন এবং বিচারককে উদ্দেশ্য করে আরও কিছু বলতে থাকেন। পরে তাঁরা এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।

আইনজীবীদের একটি সূত্র জানায়, এজলাস কক্ষে প্রথম প্রবেশ করা আইনজীবী হলেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান (লিংকন)। এ বিষয়ে মঙ্গলবার রাতে তিনি বলেন, ‘৩০-৪০ লাখ টাকা নিয়ে জামিন দেওয়া হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের বিচারক আমাদের জানিয়েছেন যে তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসকে জামিন দেওয়া হবে। আমি বললাম, আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে আমরা কী বলব? আমরা তাঁকে জামিন না দিতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি জামিন দিয়ে দেন। এ ঘটনায় আমরা আজ সকালে কোর্ট না চালানোর অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। পরে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা কোর্টে ঢুকে প্রতিবাদ জানান। এ সময় বেঞ্চ ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।’

সাদিকুর রহমান আরও বলেন, ‘পরে এই ঘটনা নিয়ে মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আমাদের কথা শোনেন। বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায়। আমরা আগামীকাল (বুধবার) জামিন বাতিলের আবেদন দেব। দেখি উনি (বিচারক) কী করেন। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব আহমেদ মঙ্গলবার রাতে বলেন, ‘আদালতে যে ঘটনা ঘটেছে, এ নিয়ে মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে বিচারকদের আলোচনা চলছে। আমি এ বিষয়ে আর বলতে পারব না।’

এজলাসে হট্টগোলের আগে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এ সময় তাঁরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ কর্মসূচিতে আইনজীবীরা বিচারক অতিরিক্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়ত উল্লাহকে অপসারণ এবং জামিন বাতিলের দাবিতে অনির্দিষ্টকাল মহানগরের সব আদালত বর্জন করার ঘোষণা দেন। এ কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পিপি মোস্তাফিজুর রহমান (বাবু), এপিপি সাইদ মোর্শেদ মামুন, অতিরিক্ত পিপি আবুল কালাম আজাদ (ইমন), অতিরিক্ত পিপি নুরুল হক (দুলাল) প্রমুখ।

আরও পড়ুন

ঘটনার বিষয়ে বরিশাল জেলা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) ও জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজ আহমেদ (বাবলু) বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি জামিন অযোগ্য। তিনি আত্মসমর্পণ করলে বিচারক রহস্যজনক কারণে জামিন দেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এই আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব জামিন দেওয়া হয়েছে। আমরা জামিনের বিরোধিতা করলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।’

আদালতের হট্টগোলের বিষয়ে মঙ্গলবার রাতে হাফিজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দুপুরে কর্মসূচি শেষ করার পর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন ও মহানগরের দুজন সরকারি কৌঁসুলি গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের জামিন আদেশ বাতিলের জন্য ওই আদালতে একটি আবেদন নিয়ে যান। কিন্তু আবেদনটি না রেখে তাঁদের অপমানজনক কথা বলেন বিচারক। এ নিয়ে সামান্য বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে। আদালতে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস গতকাল আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন পান। বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তিন নেতা জামিনে মুক্তি পান। জামিনপ্রাপ্ত অন্য দুজন হলেন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এবং বরিশাল মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান।

আরও পড়ুন