নরসিংদীর যে রেলস্টেশনে জীবন কাটালেন, তার পাশেই ববি বেগমের দাফন হলো
নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে নিহত বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগমের (৭০) জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত ১০টার দিকে মেথিকান্দা রেলস্টেশনের প্রবেশমুখের খোলা চত্বরে শত শত মানুষের অংশগ্রহণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান উপস্থিত লোকজন। পরে স্টেশনসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে ববি বেগমের দাফন হয়।
এর আগে গত শনিবার রাত দুইটার দিকে স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ববি বেগমকে মারধর করে তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় তাঁর চোখ–মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, বুধবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য ববি বেগমের মরদেহ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রাত আটটার দিকে মরদেহ স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাত ১০টায় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়ির উপপরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার বলেন, ববি বেগমের কোনো স্বজন না থাকায় প্রথমে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
জানাজায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদ রানা, রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান, মেথিকান্দা রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার এস এম জসিমসহ স্থানীয় শত শত মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ইউএনও বলেন, হামলার পর ববি বেগমের চিকিৎসাসহ সার্বিক দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন নিয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
ওসি মজিবুর রহমান বলেন, ‘ববি বেগমের মৃত্যু মর্মান্তিক। রেলওয়ে থানায় মামলা হয়েছে। তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা যাবে।’
ববি বেগমের মৃত্যুতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনের সবাই শোকাহত জানিয়ে স্টেশনমাস্টার এস এম জসিম বলেন, ববি বেগম দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটি নিজের বাড়ির মতো দেখাশোনা করতেন। প্ল্যাটফর্ম ও শৌচাগার পরিষ্কার রাখতেন।
প্রায় দুই যুগ আগে একটি ট্রেন থেকে নেমে মেথিকান্দা রেলস্টেশনেই থেকে যান বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগম। স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষই ছিল তাঁর আশ্রয়। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে প্ল্যাটফর্ম ও শৌচাগার পরিষ্কার করতেন। স্টেশন ও আশপাশের মানুষের দেওয়া খাবার ও সামান্য অর্থে তাঁর জীবন চলত। দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া টাকাগুলো তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন। হামলা ও লুটের ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।