সরকারি বরাদ্দ না পেয়ে চাঁদা তুলে নিজেরাই রাস্তা সংস্কারে নেমেছে গ্রামবাসী
কেউ কোদাল চালাচ্ছেন, কেউ ঝুড়িতে করে মাটি ফেলছেন। রাস্তার গর্ত ভরাটে ব্যস্ত নারী-পুরুষ, তরুণ ও বৃদ্ধ। পাশে খেলতে থাকা শিশুরাও ছোট ছোট হাতে সহযোগিতা করছে। যেন এক উৎসবের আয়োজন। তবে এই উৎসবের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর হতাশা। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় থেকে বারবার হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই চাঁদা তুলে গ্রামের রাস্তা সংস্কারে নেমেছেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নের রসুলপুর পকপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা।
আজ শুক্রবার সকালে গ্রামটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। গ্রামের বাসিন্দারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেই অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামের একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি মেরামত করছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে গ্রামটির প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি ইটের সলিং করা হয়েছিল। এরপর আর বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইট উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ। গত পাঁচ-ছয় বছরে রাস্তাটি বেহাল হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে কর্দমাক্ত হয়ে যায়। এতে দুই শতাধিক পরিবারের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চলাচল যেমন কষ্টকর হয়ে উঠেছে, তেমনি কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া কিংবা রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রাস্তা পাকাকরণের দাবিতে তাঁরা একাধিকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কোনো কার্যকর উদ্যোগ না পাওয়ায় নিজেরাই সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন।
মামুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামবাসী আমার কাছে এসেছিল। আমি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু বরাদ্দ না থাকায় কাজ করা সম্ভব হয়নি।’
মামুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিলন মন্ডল জানান, ওই গ্রামের রাস্তায় অনেক আগে ইটের সোলিং করা হয়েছিল। সেটি এখন নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় রাস্তাটি সংস্কার করা যায়নি। তিনি বলেন, ‘রাস্তাটির বিষয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আজ শুক্রবার সকাল থেকে গ্রামের বাসিন্দারা নিজেরাই রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন।’
গ্রামবাসীর ভাষ্য, বর্তমানে বেহাল রাস্তার কারণে অটোভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহনচলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হেঁটে চলাচল করতেও সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।
রাস্তা মেরামতের কাজে অংশ নেওয়া আজিজার রহমান, ইউসুফ আলী, জালাল উদ্দিন, একরামুল হক, মিটু মিয়া, হাশেম আলী ও আসলাম হোসেন জানান, তাঁরা সবাই বারবার ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যের কাছে গিয়েছেন। সবাই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কাজ হয়নি। বর্ষার সময় রাস্তায় হাঁটা যায় না, কৃষিপণ্যও ঠিকমতো বাজারে নেওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে গ্রামের মানুষ নিজেরাই টাকা তুলে রাস্তা মেরামত করেছেন। এলাকাবাসী চান দ্রুত রাস্তাটি কার্পেটিং করা হোক।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী বলেন, ‘গ্রামবাসী রাস্তা সংস্কারের জন্য কেউ আমার কাছে আসেননি। তাঁরা নিজস্ব অর্থায়নে রাস্তা মেরামতের কাজ করছেন, সেটি জানতাম না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে আগামী বরাদ্দে রাস্তাটির উন্নয়নকাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।’