‘যা যাইবার তো গেছেগি, এই রোদটা থাকলে বাকি ধান তোলা যাইব’
টানা চার দিনের বৃষ্টির পর সুনামগঞ্জেও রোদের দেখা মিলেছে। দুর্ভোগে পড়া হাওরের কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি নিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান কাটার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে কাটা ভেজা ধান শুকানোর জন্য রোদে দিচ্ছেন তাঁরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবারও সুনামগঞ্জ এবং জেলার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল। তবে বুধবার রাত থেকে আর বৃষ্টি হয়নি। এদিকে উজানের পাহাড়ি ঢল নামায় জেলার সুরমাসহ অন্যান্য নদী ও হাওরের পানি কিছুটা বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওরে কৃষক সুনু মিয়া (৫০) বলছিলেন, ‘যা যাইবার তো গেছেগি। এই রোদটা থাকলে বাকি ধান টেনেটুনে তোলা যাইব। ঘরের কাটা ধানও কিছুটা রক্ষা অইব।’ হাওরপারের ফিরিজপুর গ্রামের এই কৃষক জানান, তাঁর ১১ বিঘা জমির মধ্যে সাত বিঘা আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি চার বিঘার ধান এখন কাটার চেষ্টা করছেন। এ জন্য দুই ছেলে মিজানুর রহমান ও নজিবুর রহমানকে নিয়ে এসেছেন হাওরে। মিজান এবার দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়েন আর নজিবুর সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।
হাওরপারে পলিথিনের চটের ওপর ভেজা ধান মেলে দিয়েছেন জোছনা বেগম (৪৫)। তিনি জানান, তিন দিন আগে এই ধান মাড়াই করা হয়েছিল। কিন্তু রোদ না থাকায় শুকাতে পারেননি। এতে ধানে একধরনের ভ্যাপসা গন্ধ ধরেছে। এখন শুকানোর পর ধান কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সুনামগঞ্জে বুধবার সকাল নয়টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৮ মিলিমিটার। এই সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছিল ২২ মিলিমিটার, তখন সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল ৫৬ সেন্টিমিটার। তবে সোমবার রাতের তুমুল বৃষ্টি ও ঢলেই কৃষকের বড় ক্ষতি হয়েছে। সেদিন মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাপক পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়াটা স্বস্তির। এখন রোদ ওঠায় কৃষকেরা হাওরে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সুবিধা পাবেন।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হাওরে ৫১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১১ হেক্টর জমির। তাঁদের হিসাবে, পানিতে তলিয়েছে ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর। আরও চার থেকে পাঁচ দিন পর পুরো ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিন বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে ধান কাটায় ব্যাপক সমস্যা হয়েছে। কৃষকেরা মাঠে যেতে পারেননি। এখন রোদ উঠেছে, যা হাওরের জন্য ইতিবাচক। যদি আর বৃষ্টি না হয়, তাহলে কৃষকেরা বাকি জমির ধান কেটে তুলতে পারবেন।