এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সমাবর্তন
সত্যের অনুসন্ধান, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ছাড়া বড় সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়: অক্সফোর্ড উপাচার্য
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আইরিন ট্রেসি বলেছেন, পৃথিবীতে আজ শিক্ষিত নারীর ভীষণ প্রয়োজন। কেননা, শিক্ষিত নারী ছাড়া অর্থনীতি, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—কোনো ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার অধিকার থেকে নারীদের বঞ্চিত করা হলে সমাজ অনেক বড় সম্ভাবনা হারায়।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ১২তম সমাবর্তনে এ কথা বলেন আইরিন ট্রেসি। তিনি নারী অধিকার, নারীশিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ, বৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অপতথ্য, মিথ্যা তথ্যসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।
সমাবর্তন বক্তা উপাচার্য আইরিন ট্রেসি বলেন, স্বাধীন ও স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া সম্ভব নয়। সত্যের অনুসন্ধান, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্যের মতো বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এবারের সমাবর্তনে জাপান, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সাত বিশিষ্টজনকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। সাত বিশিষ্টজনের মধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আইরিন ট্রেসিকে ডক্টর অব সায়েন্স অ্যান্ড দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব হিউম্যানকাইন্ড; টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট তেরু ফুজিকে ডক্টর অব সায়েন্স; জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবেকে ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস; যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জ্যানেট অ্যানি রয়্যালকে ডক্টর অব আর্টস ফর লিডারশিপ অ্যান্ড এডুকেশনাল ইকুইটি; বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুককে ডক্টর অব সায়েন্স ইন এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট; ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকিকে ডক্টর অব আর্টস ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব পিস এবং প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানকে ডক্টর অব ক্রিয়েটিভ, রেসপনসিবল অ্যান্ড কারেজিয়াস জার্নালিজম ডিগ্রি দেওয়া হয়।
আজ শনিবার চট্টগ্রাম নগরের র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউর মেজবান হলে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৫৩ জন শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি।
সমাবর্তনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অক্সফোর্ডের উপাচার্য আইরিন ট্রেসি বলেন, ‘প্রিয় শিক্ষার্থীরা, পেছনে তাকিয়ে দেখবে—এই ডিগ্রিই তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। তোমরা কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানই অর্জন করোনি, শিখেছ কীভাবে শিখতে হয়, কীভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়—যা ভুয়া খবর, বিভ্রান্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে অত্যন্ত জরুরি।’
নারী শিক্ষার্থীদের পথচলা সহজ ছিল না উল্লেখ করে স্নায়ুবিজ্ঞানী আইরিন ট্রেসি বলেন, এইউডব্লিউ নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। কিন্তু দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলও কম নয়। অক্সফোর্ডে নারীদের জন্য পথটি সহজ ছিল না। মাত্র ১০০ বছর আগে নারীরা সেখানে ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অথচ আজ সেই নারীরাই বিশ্ব বদলে দিচ্ছেন—কোভিড টিকা থেকে শুরু করে মানবাধিকার আন্দোলন পর্যন্ত।
বেলা ১১টায় মিলনায়তনে প্রবেশ করেন সমাবর্তনে অংশ নেওয়া বিশিষ্ট অতিথি ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ছাত্রীরা পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ ও ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’। এরপর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধর্মের প্রার্থনা সংগীত পরিবেশন করেন।
এরপর শুরু হয় মূল আয়োজন। স্বাগত বক্তব্য দেন এইউডব্লিউর আচার্য শেরি ব্লেয়ার। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে কর্মজগৎ দ্রুত বদলে যাবে হয়তো এমন সব পথে, যা আমরা এখনো কল্পনাও করতে পারছি না। কিন্তু এখানে তোমরা যে শিক্ষা পেয়েছ, তা কেবল কারিগরি দক্ষতায় সীমাবদ্ধ নয়। এই শিক্ষা তোমাদের চিন্তাশীল নেতা, দায়িত্বশীল পরিবর্তন-স্রষ্টা হিসেবে গড়ে তুলবে।’
সামনের পৃথিবী সম্ভাবনায় ভরপুর উল্লেখ করে শেরি ব্লেয়ার বলেন, সেই সম্ভাবনাকে গ্রহণ করতে হবে সাহস আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিন্তু একই সঙ্গে পা রাখতে হবে মাটিতে। কারণ দারিদ্র্য, বৈষম্য, রোগ আর সহিংসতা—এসব এখনো আমাদের বাস্তবতা। নিজেদের প্রতি, নিজেদের সমাজের প্রতি এবং সমগ্র মানবতার প্রতি তোমাদের (শিক্ষার্থী) দায়িত্ব হবে উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি যেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের সেবায় নিয়োজিত হয়। তোমরা যা-ই করো না কেন, তা অবশ্যই মানবাধিকারকে সম্মান করার ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এইউডব্লিউর আচার্য বলেন, ‘আমরা এমন এক সময় পার করছি, যা নিঃসন্দেহে কঠিন। রাষ্ট্রের ভেতরে ও রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত চলছে। এর মধ্যে কিছু খবরের শিরোনামে আসে, কিছু নীরবে মানুষের জীবন তছনছ করে দেয়। এই সংকটগুলোর মানবিক পরিণতির মোকাবিলায় নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পাশে থাকতে হবে।’
অনুষ্ঠানে এইউডব্লিউর উপাচার্য রুবানা হক বলেন, ‘আজকের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৫১ জন এসেছে আফগানিস্তান থেকে। এটি এমন একটি দেশ, যেখানে এ মুহূর্তে নারীদের শিক্ষায় কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা আশা করি, একদিন তারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে নিজেদের জাতির নেতৃত্ব দেবে। ৯ জন শিক্ষার্থী এসেছে রোহিঙ্গা শিবির থেকে—এটিও এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রয়োজন আর বঞ্চনার মাঝখানে একটি নির্মম রেখা টানা। আজ ডিগ্রি নিচ্ছে সাতজন পোশাক কারখানার কর্মী। এই শিক্ষার্থীরা একসময় ভেবেছিল, তাদের জীবন কেবল সেলাই মেশিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
আমরা এমন এক সময় পার করছি, যা নিঃসন্দেহে কঠিন। রাষ্ট্রের ভেতরে ও রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত চলছে। এর মধ্যে কিছু খবরের শিরোনামে আসে, কিছু নীরবে মানুষের জীবন তছনছ করে দেয়। এই সংকটগুলোর মানবিক পরিণতির মোকাবিলায় নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পাশে থাকতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আহমেদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার অধিকার তোমাদের আছে। যে ঝুঁকিই নাও, আমরা তোমাদের পাশে থাকব। তোমরা আমাদের কন্যা।’
এশিয়ার প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার এক ব্যতিক্রমী স্বপ্ন নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন। শুরুতে ছিল ৬টি দেশের ১২৭ শিক্ষার্থী। এখন ২২টি দেশের ২ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন সাত বিশিষ্ট ব্যক্তি
এবারের সমাবর্তনে জাপান, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সাত বিশিষ্টজনকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়।
সাত বিশিষ্টজনের মধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আইরিন ট্রেসিকে ডক্টর অব সায়েন্স অ্যান্ড দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব হিউম্যানকাইন্ড; টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট তেরু ফুজিকে ডক্টর অব সায়েন্স; জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবেকে ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস; যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জ্যানেট অ্যানি রয়্যালকে ডক্টর অব আর্টস ফর লিডারশিপ অ্যান্ড এডুকেশনাল ইকুইটি; বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুককে ডক্টর অব সায়েন্স ইন এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট; ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকিকে ডক্টর অব আর্টস ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব পিস এবং প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানকে ডক্টর অব ক্রিয়েটিভ, রেসপনসিবল অ্যান্ড কারেজিয়াস জার্নালিজম ডিগ্রি দেওয়া হয়।
‘বিভাজনে ভরা এই সময়ে শিক্ষা হতে পারে সেতু’
এইউডব্লিউর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা জানিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট তেরু ফুজি বলেন, ‘এই অসাধারণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। এইউডব্লিউ ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এই অংশীদারত্ব ভবিষ্যতেও আরও শক্তিশালী হবে।’
২০০৮ সাল থেকে এইউডব্লিউর সঙ্গে যুক্ত আছেন জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবে। তিনি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এইউডব্লিউর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশ্ব অনেক প্রত্যাশা করবে। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, তোমার নিজের অন্তরের কথা শোনা। তোমাদের হৃদয় কী বলছে? সেই কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিয়ো। সেটিকে মনে রেখে এগিয়ে চলো, আর পৃথিবীর জন্য কাজ করে যাও।’
সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে আবেগাপ্লুত যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জ্যানেট অ্যানি রয়্যাল বলেন, ‘আমার চোখে পানি চলে আসছে। সত্যি বলতে কি, আজ এই সম্মানসূচক ডিগ্রি গ্রহণ করা আমার জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় সম্মান হলো—এই অসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি সত্যিকারের, গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠা। আজকের পর থেকে আমি নিজেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আজীবন সমর্থক, একজন “চ্যাম্পিয়ন” বলে ভাবব।’
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামারভিল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জ্যানেট অ্যানি রয়্যাল বলেন, শিক্ষাজীবন বদলায়। সমাজ বদলায়। দেশ বদলায়। কমিউনিটিকে বদলে দেয়। শিক্ষা হলো এমন এক শক্তি, যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিভাজনে ভরা এই সময়ে শিক্ষা হতে পারে সেই সেতু, যা সমাজের ক্রমবর্ধমান দূরত্বগুলোকে কাছাকাছি আনে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুক বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয় যখন চালু হয়েছিল, তখন অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, শুধু নারীদের জন্য আলাদা একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন প্রয়োজন? আমার উত্তর ছিল খুব সহজ—এই বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি চালু হলে, তখনই আপনারা এর ফলাফল দেখতে পাবেন। আজ আমি বিশ্বাস করি, যাঁরা একসময় মনে করেছিলেন এটি প্রয়োজনীয় নয়, তাঁরা এখন এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য দেখে নিজেরাই বুঝতে পেরেছেন—কতটা ভুল ছিলেন তাঁরা।’
বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া ইতো নাওকি বলেন, বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর কাজ মূলত তিনটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা জোরদার করা—বিশেষ করে নারীদের জন্য শিক্ষা ও জীবিকাভিত্তিক সুযোগ তৈরি করা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উন্নয়নের গুরুত্ব। তিনি বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা আমি বারবার তুলে ধরেছি। বেশির ভাগ সময় ব্যক্তিগত আলোচনায়, আবার কখনো কখনো প্রকাশ্য মঞ্চেও।’
সৃজনশীল, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতায় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কখনোই সহজ ছিল না। এখানে গণতন্ত্র বারবার অস্থিরতা, পশ্চাদপসরণ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছায়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এমন সময়ে সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ, কখনো বিপজ্জনকও। শক্তিশালী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপ থাকে, কখনো কখনো কর্তৃত্ববাদী সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপও আসে।
ঠিক এ কারণেই সাংবাদিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি বলে মন্তব্য করেন প্রথম আলো সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘আমি এই সম্মান শুধু নিজের জন্য গ্রহণ করছি না; গ্রহণ করছি বাংলাদেশের সেই সব সাংবাদিকের পক্ষ থেকে, যাঁরা প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে কাজ করে যান—প্রায়ই ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে।’
মতিউর রহমান বলেন, চিন্তার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা—এই দুটো ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। মানবাধিকার ছাড়া, ভোটাধিকার ছাড়া গণতন্ত্র বেঁচে থাকতে পারে না। আজ বাংলাদেশ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন, সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি গণমাধ্যম কীভাবে হামলার শিকার হয়েছে, আগুনে পুড়েছে। তবু আশাহীন নই। কারণ, তরুণেরা ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন এখনো ছাড়েনি।’
উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা
১২তম সমাবর্তনে অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীরা ছিলেন দারুণ উচ্ছ্বসিত। তাঁরা কখনো সমাবর্তনের টুপি উড়িয়েছেন শূন্যে, কখনো দল বেঁধে ছবি তুলেছেন। এর ফাঁকে কথা হয় আফগানিস্তান থেকে আসা শিক্ষার্থী নার্গেস হুসাইনের সঙ্গে। ২০২২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। নার্গেস প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এই ডিগ্রি আফগানিস্তানের সব নারীর জন্য উৎসর্গ করছেন। কারণ, সেখানে এখন নারীদের শিক্ষা অর্জনের পথ অত্যন্ত সংকুচিত।
আফগানিস্তানের কাবুল শহর থেকে বহু বছর আগে পাকিস্তানের কোয়েটা প্রদেশে চলে গিয়েছিলেন আরেক শিক্ষার্থী নুরিয়া মহসিনি। তাঁর পরিবার এখন কোয়েটাতেই থাকছে। নুরিয়াও এইউডব্লিউতে ভর্তি হয়েছেন ২০২২ সালে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এইউডব্লিউ খুবই বৈচিত্র্যময় বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চান।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নৃত্যের মাধ্যমে পরিবেশন করেন। শেষে অতিথিরা শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেন।