প্রকৌশলী থেকে আঙুরচাষি, এক বছরেই আয় ৩৬ লাখ টাকা

রাজশাহীর বাগমারায় নিজের বাগানে চাষি ইমাম হাসানছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাসনিপুর গ্রামের ইমাম হাসান সাগর একসময় একটি শীর্ষ মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের প্রকৌশলী ছিলেন। চাকরি ছেড়ে বাবার কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আঙুর চাষ করে সফলতার মুখ দেখেছেন তিনি। তিন বিঘা জমিতে গড়ে তোলা আঙুর বাগান থেকে আঙুর ও চারা বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় ৩৬ লাখ টাকা।

ইমাম হাসানের বাগানে এখন প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থী, কৃষি উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে হাসনিপুর পরিচিতি পেয়েছে ‘আঙুরের গ্রাম’ হিসেবে। এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের পথিকৃৎ হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন ইমাম হাসান।

ইমাম হাসান বাগমারা উপজেলার গণিপুর ইউনিয়নের হাসনিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা বোরহান উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ করতেন। বাড়ির পাশের দুই বিঘা জমিতে ছিল পানের বরজ; কিন্তু রোগবালাই ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়েন তিনি। তখন বিকল্প ফসলের চিন্তা শুরু হয়।

ইমাম হাসান ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা শুরু করেন। এরপর গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন।

ইমাম হাসান বলেন, একদিন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে আঙুর চাষে সফল এক কৃষকের প্রতিবেদন দেখে বাবার আগ্রহ জন্মায়। বাবা বিষয়টি নিয়ে তাঁর (ইমাম হাসান) সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে আঙুর চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালে পানের বরজ ভেঙে সেখানে আঙুরের চাষ শুরু করেন। পরে আরও এক বিঘা জমি যুক্ত করে মোট তিন বিঘা জমিতে আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে ব্ল্যাক ম্যাজিক, কার্নিভ্যাল, হেলিওডর, শাইন মাসকাট, ব্ল্যাক রুবি, গ্রিন লং ও ল্যাম্বরগিনি জাতের আঙুর আছে। এসব জাতের চারা কিনতে বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্যোক্তারা আসছেন।

রাজশাহীর বাগমারায় আঙুর বাগানে দর্শনার্থীর ভিড়। সম্প্রতি উপজেলার হাসনিপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

প্রথম বছরেই লাভের মুখ দেখেছেন ইমাম হাসান। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, যশোর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চারা কিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু চারা বিক্রিই নয়, আঙুর বিক্রি করেও আয় করেছেন প্রায় ২১ লাখ টাকা।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও চাষির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগানে ৩৬০টি গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০ কেজি করে আঙুর পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ২০০ কেজি আঙুর বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি আঙুর বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা দরে। সব মিলিয়ে আঙুর বিক্রি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। উৎপাদনে খরচ হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা।

ইমাম হাসান ও তাঁর বাবা বোরহান উদ্দিন বলেন, প্রথম বছরেই এমন সাফল্য পাবেন, তা তাঁরা ভাবেননি। তাঁদের মতে, অন্য অনেক ফসলের তুলনায় আঙুর চাষ বেশি লাভজনক।

বোরহান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শুধু পরিকল্পনা করেছিলাম। তবে ছেলে ইন্টারনেট দেখে এটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। কোনো সমস্যা হলে সেখান থেকেই বেশি পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার ছেলে চাষে সফল হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ছেলে চাকরি ছাড়ায় মন খারাপ হলেও এখন সে কষ্ট ভুলে গেছি।’

গত ৩১ মে সরেজমিনে দেখা যায়, গণিপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশ দিয়ে কয়েক মিনিট এগোতেই হাসনিপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় ওই বাগান। বাগানের দিকে যেতে দেখা যায়, অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশুকে। কেউ বাগান থেকে ফিরছেন, কেউ আবার প্রবেশ করছেন। বাগানে ঢুকতেই দেখা মেলে থোকা থোকা আঙুরে ভরা লতা। দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে বাগান দেখছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও ধারণ করছেন। কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতাকেও ভিডিও তৈরি করতে দেখা যায়। বাগানমালিকের পক্ষ থেকে আগত মানুষদের বিভিন্ন জাতের আঙুর খেতে দেওয়া হচ্ছিল।

সেখানে কথা হয় পাইকারি ক্রেতা মোজাম্মেল হক ও আফজাল হোসেনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, গড়ে ৩০০ টাকা কেজি দরে আঙুর কিনছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব আঙুর পাঠানো হবে। স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদাও রয়েছে।

এখন বাগানটি পর্যটনকেন্দ্রের মতো রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়েছে।

গাজীপুর থেকে আসা অতিরিক্ত জেলা জজ আবু রায়হান জানান, ফেসবুকে দেখে ঈদের ছুটিতে বাগানটি দেখতে এসেছেন। অন্যদিকে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, আঙুরের বাগান ঘুরে দেখছেন, ছবিও তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।

নাটোরের সিরাজুল ইসলাম, নওগাঁর মোতালেব হোসেন ও দুর্গাপুরের বেলাল হোসেন বলেন, তাঁরা বাগান করার জন্য সরাসরি এখান থেকে চারা কিনেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়েছেন।

ইমাম হাসানের আঙুর বাগান পরিদর্শনে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। সম্প্রতি রাজশাহীর বাগমারার হাসনিপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

দর্শনার্থীর ভিড় সম্পর্কে ইমাম হাসান বলেন, প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রচার হওয়ায় এই ভিড়। ঈদের পরের দিন অন্তত ৭ থেকে ১০ হাজার দর্শনার্থী এসেছিলেন। শিশু, কৃষক, গৃহবধূ, শিক্ষক, কৃষিবিদ ছাড়াও সরকারি অনেক পদস্থ কর্মকর্তা এসেছেন। তিনি বলেন, দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে একদিন নোটিশ দিয়ে বাগান বন্ধও রাখতে হয়েছিল।

বাগানে আগত ব্যক্তিদের আঙুর খাওয়ানোর বিষয়ে ইমাম হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত তিন কেজি আঙুর খেতে দিই দর্শনার্থীদের। অনেকের ধারণা, আমাদের দেশের মাটি আঙুর চাষের উপযোগী নয়, যেসব চাষ হয় সেগুলো টক বলে প্রচলিত রয়েছে। এ ধারণা ভাঙাতে আপ্যায়ন করা হয়।’

গত ২৩ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শহিদুল্লাহ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বাগানটি পরিদর্শন করেন।

হাসনিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও সাফিক্স প্রি-ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার ইমাম হাসান রীতিমতো ম্যাজিক দেখিয়েছেন গ্রামে আঙুর চাষ করে। নিজের ভাগ্য বদলে ফেলার পাশাপাশি গ্রামটিকেও পরিচিত করেছেন।’

বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাগমারায় ইমাম হাসান বাণিজ্যিকভাবে প্রথম আঙুর চাষ করছেন। এলাকার মাটিতে যে আঙুর চাষ করা সম্ভব এবং লাভবান হওয়া যায়, তার একটি সফল উদাহরণ তিনি। কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর উদ্যোগ অনুকরণীয় হতে পারে।