সরকারি গাছ কেটে খাট-সোফা বানানোর অভিযোগ নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে

সিলেট এলজিইডি কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলীর বাসভবনে স্তূপ করে রাখা গাছের গুঁড়ি
ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সীমানার ভেতরের বেশ কয়েকটি গাছ বিনা অনুমতিতে কেটে সেগুলো দিয়ে আসবাবপত্র (খাট ও সোফা) বানানো এবং বাসার অভ্যন্তরীণ সজ্জা করানোর অভিযোগ উঠেছে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মো. ইনামুল কবীর এলজিইডির সিলেট জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী।

গত ২ নভেম্বর এলজিইডি ‘সাইট’ পরিদর্শনে গাছ কাটার বিষয়টি জানতে পারেন সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আবদুস সামাদ। এরপর ৮ নভেম্বর তিনি বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে একটি চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানান। কয়েকটি কাটা গাছের গুঁড়ি একজন সহকারী প্রকৌশলীর বাসভবনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

একই সঙ্গে এক চিঠিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ওই গাছের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে ইনামুল কবীরকে অনুরোধ করেন আবদুস সামাদ।

এলজিইডি সিলেট জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবীর সরকারি গাছ কেটে আসবাব বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরের বন্যায় বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি মরা গাছ পড়ে পুকুরপাড় ভেঙে যাচ্ছিল। ওই সময় গাছ কেটে পাড় ঠেকানো হয়। কার্যালয়ের পাশে খালে একটি মরা গাছ পড়ে পানির প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এ কারণে পরে ওই গাছটি কেটে ফেলা হয়। এই গাছ দুটি কাটার আগেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া কার্যালয়ের অভ্যন্তরে দুটি সেগুনগাছ পড়ে ছিল। তবে এ গাছ দুটি কাটার বিষয়ে বন বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সে সময় জরুরিভাবে গাছ দুটি কেটে রাখা হয়েছিল। পরে গত অক্টোবরে বন বিভাগকে সেগুনগাছের ব্যাপারে জানানো হয়। তারা এসে গাছ দুটির মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন। গাছ দুটির গুঁড়িগুলো নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।

ইনামুল কবীর বলেন, ‘আমার এক সহকর্মী অভিযোগ দিয়েছেন বলে শুনেছি। তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এমনটি করেছেন। কাটা গাছের কাঠ দিয়ে কোনো সোফা বা খাট বানানো হয়নি। কার্যালয়ের আসবাবপত্র নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই কেনা হয়েছে।’

বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কার্যালয়ের কোনো গাছ কাটতে হলে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদন নিতে হয়। এরপর বন বিভাগে আবেদন করতে হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগের কর্মকর্তারা গিয়ে গাছের মূল্য নির্ধারণ করেন। পরে দরপত্র বা নিলামের মাধ্যমে গাছ বিক্রির পর টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে দেওয়া চিঠিতে কবে গাছ কাটা হয়েছে, তা লেখেননি আবদুস সামাদ। তবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ইনামুল কবীর এলজিইডি সিলেট কার্যালয়ের কয়েকটি গাছ কাটেন। যেগুলো দিয়ে তিনি সোফা ও খাট বানিয়েছেন এবং বাসার অভ্যন্তরীণ সজ্জা করিয়েছেন। কয়েকটি গাছের গুঁড়ি একজন সহকারী প্রকৌশলীর বাসভবনে স্তূপাকারে রেখেছেন। গত বছর ৩২টি গাছ মৃত বৃক্ষ দেখিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুর ইসলাম ৭ নভেম্বর কাটা গাছের মূল্য নির্ধারণ করে নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুলকে চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৪ অক্টোবর গাছের মূল্য নির্ধারণের আবেদন করেন এনামুল। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুটি সেগুনগাছের ছয়টি গুঁড়ির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূল্য নির্ধারণের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে আরও একটি আবেদন করেন কাজী আবদুস সামাদ। এতে চিঠিতে উল্লিখিত গাছের গুঁড়ির সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুর ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু দুটি গাছ ঝড়ে পড়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি। যদি আরও গাছ কাটা হয়ে থাকে, তবে সেটি তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।’

গত মঙ্গলবার সিলেট নগরের নবাব রোড এলাকায় অবস্থিত বিভাগীয় এলজিইডি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে একটি পুকুর। পুকুরপাড়ে তিনটি গাছের গুঁড়ি ও শুকনা ডালাপালা স্তূপ করে রাখা।

কার্যালয়ের পুকুরপাড়ে কাটা গাছের দুটি গোড়া দেখতে পান এই প্রতিবেদক। তবে সিলেট এলজিইডি কার্যালয়ে দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এ বছরের জুন মাসের বন্যার পর বেশ কয়েকটি গাছ কাটা হয়েছে অনুমতি ছাড়াই। সেসব কাটা গাছের গোড়া তুলে ফেলে সৃষ্ট গর্তগুলোও মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ভেতরে আসবাব তৈরির কাজ করেছেন মায়ের দোয়া ফার্নিচারের পরিচালক মো. সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কয়েকটি টেবিল ও অভ্যন্তরীণ সজ্জার কাজ করেছি। এ জন্য সেগুন কাঠ এলজিইডি কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া সজ্জা ও টেবিলের জন্য বোর্ড বাইরে থেকে কেনা হয়েছে। আগে এক মিস্ত্রি কাজ করে গেছেন, তিনি খাটসহ সোফা বানিয়েছেন বলে শুনেছি।’  

এলজিইডি সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী ইনামুল কবীর গাছগুলো কেটে সরকারি কিছু আসবাব বানিয়ে থাকতে পারেন। এতে দোষের কিছু দেখেন না তিনি।

এ বিষয়ে এলজিইডি সিলেট অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নির্মল কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছ কাটতে হলে বন বিভাগের কাছে অনুমতি নেওয়া লাগে। আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অবহিত করতে হয়। ওই নির্বাহী প্রকৌশলী গাছ কাটার জন্য কোনো সম্মতি নেননি। কাউকে অবহিতও করেননি।