‘পুলিশ এখনো আসামিদের ধরে নাই, থানায় গেলে খালি কয় তদন্ত চলতাছে’

ছেলে আশরাফুল আলমের ছবি নিয়ে কাঁদছেন গফরগাঁও পৌর এলাকার শিলাসী গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন ও শান্তা আক্তার দম্পতি। গত শনিবার তোলাছবি: প্রথম আলো

তিন মাস আগে রাত ১২টা ১ মিনিটে বন্ধুদের নিয়ে নিজের জন্মদিনের কেক কাটেন আশরাফুল আলম ওরফে রবিন (২৩)। অনুষ্ঠান শেষে বাড়িতে ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করলেও এখনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত আশরাফুল ময়মনসিংহের গফরগাঁও পৌর এলাকার শিলাসী গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন ও শান্তা আক্তার দম্পতির ছেলে। গত ৮ জুন দিবাগত রাতে তিনি দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত হন। ঘটনার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মূল আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ তাঁর পরিবার। এ নিয়ে এলাকার ছাত্র-জনতার ব্যানারে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

গত শনিবার দুপুরে শিলাসী গ্রামে আশরাফুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি বাড়িতে তাঁদের বসবাস। একটি কক্ষে ছেলের ছবির সামনে কাঁদছেন মা শান্তা আক্তার। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তাঁর কান্না থামছেই না।

আহাজারি করতে করতে শান্তা আক্তার বলেন, ‘আমার একটাই ছেলে। বন্ধুদের সঙ্গে জন্মদিনের কেক কেটে বাড়ি ফেরার পথে কোপাইয়া মারল। মরিচের গুঁড়া ছিটাইয়া কুপাইয়া হাত কাইট্টা দিল, মাথায় রড দিয়া পিডাইল। আমার ছেলের তো কোনো দোষ ছিল না। এত দিন হইয়া গেল; অথচ পুলিশ এখনো আসামিদের ধরে নাই। থানায় গেলে খালি কয় তদন্ত চলতাছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

ছেলের জামাকাপড় দেখিয়ে কাঁদছেন মা শান্তা আক্তার। গত শনিবার তোলা
ছবি: প্রথম আলো

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুন রাত ১২টা ১ মিনিটে গফরগাঁও ডাকবাংলো চত্বরে বন্ধুদের আয়োজনে ২৩তম জন্মদিনের কেক কাটেন আশরাফুল। অনুষ্ঠান শেষে রাত পৌনে একটার দিকে বন্ধু শাকিবুল হাসানের মোটরসাইকেলে করে বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে গফরগাঁও পৌর শহরের শিলাসী মাজার রোড এলাকায় চোখেমুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে তাঁদের গতিরোধ করে একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় শাকিবুল পালাতে পারলেও আশরাফুলকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে দুর্বৃত্তরা। হামলায় তাঁর বাঁ হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে রাত সোয়া তিনটার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

এ ঘটনার পর ১০ জুন আশরাফুলের বাবা মোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে কলেজ রোড এলাকার আবদুল মোতালেবের ছেলে মো. রাজিবকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়। এরপর অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এর আগে ২০২১ সালে স্থানীয় একটি ফুটবল খেলা নিয়ে গ্রেপ্তার রাজিবের সঙ্গে আশরাফুল ও তাঁর বন্ধুদের মারামারি হয়। সেই পুরোনো প্রতিশোধ নিতেই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন বাবা মোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার শেষ বয়সের একমাত্র ভরসা ছিল ছেলে। পুলিশ খালি কয় কাজ করতেছে। আমার ছেলেরে কারা কী কারণে মারল, তা এখনো জানতে পারলাম না।’

হামলার সময় আশরাফুলের সঙ্গে থাকা শাকিবুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ছেলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তাঁর বাবা আবদুল মতিন বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে চার দিন আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে সে।’

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন রাজিবকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কিন্তু রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেও তাঁর কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে নিহত আশরাফুলের সঙ্গে রাজিবদের বিরোধ ছিল। এ ঘটনায় অন্য যাঁরা জড়িত, তাঁদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই সবকিছু পরিষ্কার হওয়া যাবে। তদন্তের স্বার্থে তাঁরা অনেক কিছু বলতে পারছেন না।