‘ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাংকে টাকা রেখেছিলাম, এখন সংসারও চলছে না’

ব্যাংকে সঞ্চিত টাকা মুনাফাসহ ফেরত দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেন আমানতকারীরা। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের কোতােয়ালিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনেছবি- জুয়েল শীল

‘দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সঞ্চয়, পেনশন আর জমি বিক্রির টাকা রেখেছিলাম পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ব্যাংকের প্রতি আস্থা রেখেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সেই আমানত ফেরত না পেয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছি। মুনাফা দূরের কথা, জমা রাখা টাকাও পাইনি। এখন সংসারও চলছে না।’

আজ সোমবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে এমন কথা বলেন একজন আমানতকারী। সাইদুল ইসলাম নামের ওই আমানতকারী ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছিলেন। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালুর দাবিতে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে এসে এ কথা বলেন তিনি। ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন-চট্টগ্রাম বিভাগ’ এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

বিক্ষোভে আমানতকারীরা হেয়ার কাট বাতিলের দাবি জানান। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের কোতােয়ালিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে
ছবি- জুয়েল শীল

এর আগে বেলা ১১টার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড়ে অবস্থান নেন আমানতকারীরা। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তাঁরা আমানত ফিরে পেতে ‘হই হই রই রই, আমানতের টাকা গেল কই’; ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’, ‘হেয়ার কাট, হেয়ার কাট, মানি না মানব না’-সহ নানা স্লোগান দেন।

আমানতকারীরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আমানতের ওপর গত দুই বছরের মুনাফা কর্তন এবং মাত্র ৪ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দীর্ঘ দুই বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে আমানত উত্তোলন করতে না পারায় তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

বিক্ষোভে আমানতকারীরা তাঁদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে, ‘হেয়ার কাট’ (মুনাফা কেটে রাখা) নীতি বাতিল করে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফাসহ মূল আমানত ফেরত দেওয়া, সব ব্যাংকের মতো স্বাভাবিক লেনদেন চালু, তারল্যসংকট মোকাবিলায় বিশেষ সহায়তা, মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর, ডিপিএস ও এমটিডিআরের টাকা চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ এবং আগের চুক্তিভিত্তিক মুনাফার হার বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।

এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারী নাজিয়া হক বলেন, ‘ব্যাংকে আমানত রাখা কোনো বিনিয়োগের ঝুঁকি নয়, এটি একজন নাগরিকের নিরাপত্তার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। কিন্তু এখন চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, সংসারের ব্যয় এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও আমরা আমাদের সঞ্চয় ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, শুধু আমাদের ন্যায্য আমানত ও মুনাফা ফেরত চাই।’

আমানতকারীদের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর যাবৎ নিজেদের জমানো অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না তাঁরা। ব্যাংক-কোম্পানি আইন এবং আমানত রাখার চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ ফেরত পাওয়া আইনসিদ্ধ অধিকার হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বঞ্চিত। এর ফলে আনুমানিক ৭৫ লাখ পরিবারের প্রায় ৩ কোটি সদস্য আজ চরম মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে পারছেন না।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছি। আমরা আমাদের ন্যায্য অর্থের জন্যে আন্দোলন করছি। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া না হলে, আমরা কঠিন কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।’

উল্লেখ্য, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকে হেয়ার কাট বাতিল এবং লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন আমানতকারীরা। ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে।