যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক পড়ান ইংরেজি, দর্শনের শিক্ষক বাংলা
যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকসংকটের কারণে জোড়াতালি দিয়ে চলছে পাঠদান। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ে পাঠদান করাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শিক্ষাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
বিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি, বাংলা ও বিজ্ঞান বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। অন্যান্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনবলকাঠামো অনুযায়ী, অন্তত দুজন করে শিক্ষক থাকা কথা। কলেজ পর্যায়ে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিত বিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে একজন করে শিক্ষক আছেন। ইংরেজি ও বাংলা বিষয়েও আছেন একজন করে শিক্ষক।
বিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক মনিরুল আলম ইংরেজি বিষয় পড়ান। বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় পরিসংখ্যান বিষয়ের শিক্ষক শাহ আলম বিজ্ঞানের ক্লাস নেন। আর বাংলা বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় দর্শন বিষয়ের শিক্ষক আবু সাঈদ বাংলা পাঠদান করেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনটিতে তৃতীয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বর্তমানে ৬০ শিক্ষকের বিপরীতে আছেন ২৬ জন। আট বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের সময় যাচাই-বাছাইয়ে ৩১ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হওয়ায় এবং নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।
এ প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১১। এর মধ্যে বিদ্যালয় পর্যায়ে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৮৫০ শিক্ষার্থীর গণিত বিষয়ে পাঠদানের জন্য আছেন একজন মাত্র শিক্ষক। থাকার কথা দুজন গণিত শিক্ষক। কলেজ পর্যায়ে প্রতিটি বিষয়ে চারজন করে শিক্ষক থাকার কথা। সে হিসাবে বিজ্ঞান শাখার পাঁচটি বিষয়ে ২০ জন শিক্ষক থাকার কথা। সেখানে আছেন ৪ জন। ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় চারটি বিষয়ে ১৬ জন শিক্ষক থাকার কথা। সেখানে দুটি বিষয়ে একজন করে মোট দুজন শিক্ষক আছেন। অপর দুটি বিষয়ে কোনো শিক্ষকই নেই।
শিক্ষকসংকটের কারণে প্রতিদিন ২০টি ক্লাসের সমন্বয় সাধন ও গুণগত মান রক্ষা করা মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে অন্য বিষয়ের পাঠদান চালাতে হচ্ছে।
গত ২৭ জুলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেল। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের পর বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে নতুন করে শিক্ষকের কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি। বাধ্য হয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করাতে হচ্ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার গুণগত মানে পড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে পড়ালেখার মান দিন দিন নিচে নামছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ভালো পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় বলে পরীক্ষার ফলাফল কিছুটা রক্ষা পায়। তবে বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো পড়াশোনা হচ্ছে না।
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকলে পাঠদান আরও ভালো হতো। তাদের চাওয়া, দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হোক।
প্রতিদিন একই সময়ে অন্তত ২০টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলে। অথচ বিদ্যালয় শাখায় ১২টি শ্রেণির বিপরীতে আছেন ৯ জন শিক্ষক, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৩০ জন শিক্ষক। কলেজ শাখায় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উদ্ভিদবিদ্যায় একজন করে শিক্ষক আছেন। উচ্চতর গণিতে কোনো শিক্ষক নেই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একটি সূত্র জানায়, ২০০৩–০৪ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে যশোর শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালে পাঠদান শুরুর পর ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এটি সরকারি করা হয়। জাতীয়করণের সময় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবল ছিলেন ৫৭ জন শিক্ষক। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করে ২৬ শিক্ষককে রাজস্ব ভুক্ত করা হয়। অন্যদের বাদ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মো. আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে প্রতিদিন ২০টি ক্লাসের সমন্বয় সাধন ও গুণগত মান রক্ষা করা মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে অন্য বিষয়ের পাঠদান চালাতে হচ্ছে। বিদ্যালয় শাখায় গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে পদ শূন্য। তাঁরা দ্রুত নতুন পদ সৃষ্টি ও শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
বিদ্যমান ক্লাস রুটিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র ঘেঁটে জানা যায়, প্রতিদিন একই সময়ে অন্তত ২০টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলে। অথচ বিদ্যালয় শাখায় ১২টি শ্রেণির বিপরীতে আছেন ৯ জন শিক্ষক, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৩০ জন শিক্ষক। কলেজ শাখায় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উদ্ভিদবিদ্যায় একজন করে শিক্ষক আছেন। উচ্চতর গণিতে কোনো শিক্ষক নেই। একইভাবে ব্যবসায় শিক্ষা ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও আছে শিক্ষকসংকট।
প্রতিষ্ঠানটির আগের সুনাম ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো অনুযায়ী, নতুন পদ সৃষ্টি করে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সরকারি করার সময় নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়নি। যে কারণে শিক্ষক পদে শূন্যতা থেকে গেছে। কলেজের অধ্যক্ষ এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠালে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নতুন পথ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।