ঢাকার নবাবগঞ্জে ছাত্র–শিক্ষক নেই, তবু কলেজ

একনজরে ঢাকার নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ

শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীও নেই। আট বছর ধরে পাঠদানও বন্ধ। তবু ঢাকার নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা এখনো কাগজে-কলমে বহাল। ১২০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে এখনো ‘কলেজ’ যুক্ত থাকলেও বাস্তবে সেখানে নেই কোনো কার্যক্রম।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খানের প্রচেষ্টায় নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুলে কলেজ শাখা চালু হয়। প্রথম বর্ষে ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। এরপর ২০১৫ সালে কলেজ থেকে ৫০ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। পাস করেন ২৮ জন। পরের বছর অন্যরা পরীক্ষা দেন। ২০১৭ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ রেজাউল করিম অবসরে গেলে কলেজের ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কর্তৃপক্ষ আর কলেজ শাখা চালু করেনি। সে সময় চারজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। পরে তাঁরাও অন্যত্র চলে যান। কলেজের জন্য আলাদা কোনো ভবন নেই। স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান চলত।

২০১৮ সালে সরকারি হওয়া এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী আছে প্রায় ১ হাজার ২০০। শিক্ষক আছেন ১৭ জন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, কলেজের শুরুটা ভালো হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক কলেজ শাখার বিরোধিতা করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও সব সুযোগ–সুবিধা না থাকায় ধীরে ধীরে আগ্রহ কমে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এক কিলোমিটারের মধ্যে দোহার নবাবগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও নবাবগঞ্জ মহিলা কলেজ অবস্থিত। ফলে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশায় শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ায় কলেজ শাখায় ভর্তি কার্যক্রম পুরোটাই বন্ধ হয়ে যায়।

এখানে নেই কোনো ছাত্র। নেই শিক্ষক; কিন্তু এখনো কীভাবে কলেজ হিসেবে চলে?
আজাদ রহমান, স্থানীয় বাসিন্দা

সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকে ‘নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ লেখা দেখা যায়। প্রশাসনিক নথিপত্রেও কলেজ শাখার অস্তিত্ব বজায় আছে। কলেজের অনুমোদন থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে এখনো অধ্যক্ষ পদ রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম না থাকার পরও নামের সঙ্গে কলেজ যুক্ত থাকায় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকেই। নামের কারণে অনেক সময় বিভ্রান্তিও তৈরি হয়।

নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবদুল মান্নান বলেন, ২০১৩ সালে কলেজ কার্যক্রম চালু হয়। তিন–চার বছর পর তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। তবে সরকারীকরণ গেজেটে কলেজ অংশ উল্লেখ আছে। সর্বশেষ ২০২১ সালে অনিয়মিত একজন পরীক্ষা দেন বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ। বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, কলেজের অনুমোদন রয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে যদি কখনো কাজে লাগানো যায়, তাঁরা সেই চেষ্টা করবেন।

কলেজটির বিষয়ে গতকাল বিকেলে যোগাযোগ করা হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অবশ্য বোর্ডের কলেজ শাখার পরিদর্শক হুমায়ুন কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবদুল মান্নান বলেন, ২০১৩ সালে কলেজ কার্যক্রম চালু হয়। তিন–চার বছর পর তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। তবে সরকারীকরণ গেজেটে কলেজ অংশ উল্লেখ আছে।

স্থানীয় অভিভাবকেরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারির অভাবের কারণে শিক্ষার্থীহীন একটি কলেজ শাখা দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে কলেজ শাখাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া অথবা প্রয়োজন হলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কলেজ শাখা চালু রাখার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকলে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা দরকার।

স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ রহমান বলেন, এখানে নেই কোনো ছাত্র। নেই শিক্ষক; কিন্তু এখনো কীভাবে কলেজ হিসেবে চলে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব কেবল কাগজে-কলমে নয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই অর্থবহ হয়ে ওঠে।