আবারও কন্যাসন্তান হওয়ায় ক্লিনিকে স্ত্রী–সন্তানকে ফেলে রেখে চলে যান বাবা
একটি কন্যাসন্তান আগেই ছিল। দ্বিতীয়বারও কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার খবর শুনেই স্ত্রী ও নবজাতককে ক্লিনিকে ফেলে উধাও হয়ে যান বাবা। কোনো খোঁজ নিচ্ছিলেন না নবজাতক ও স্ত্রীর। এতে বিপাকে পড়ে যায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি জানতে পেরে এগিয়ে আসেন কেশবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
এ ঘটনা উপজেলার মধ্যকুল গ্রামের। এই গ্রামের রুহুল আমিনের দুই বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ৮ জুলাই কেশবপুর শহরে মাতৃমঙ্গল নামের একটি ক্লিনিকে রুহুল আমিনের স্ত্রী মোসাম্মৎ সাজেদা (২০) আরেকটি কন্যাসন্তান জন্ম দেন। এই খবর জানতে পেরে খুবই অসন্তুষ্ট হন রুহুল আমিন। এর পর থেকে তিনি ওই ক্লিনিকে যাওয়া বন্ধ করে দেন। স্ত্রী ও শিশুসন্তানের খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন না। নবজাতক ও প্রসূতিকে রাখতে গিয়ে ক্লিনিকের মালিকও অসহায় হয়ে পড়েন।
এই খবর জানতে পেরে কেশবপুরের ইউএনও রেকসোনা খাতুন আজ বুধবার ওই প্রসূতি মা ও নবজাতকের খোঁজ নেন। পরে সন্তানসহ সাজেদাকে তাঁর মায়ের বাড়ি মনিরামপুর উপজেলার বাঙালিপুর গ্রামে পাঠিয়ে দেন। এ সময় প্রসূতিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, কিছু খাবার ও অন্যান্য খরচের জন্য কিছু টাকা দেওয়া হয়। ইউএনওর অনুরোধে ক্লিনিকের মালিক জাহিদুল ইসলাম স্বেচ্ছায় ওই প্রসূতির অস্ত্রোপচারের ১২ হাজার টাকা মওকুফ করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেন রুহুল আমিন। রুহুল আমিন বলেন, ট্রাকচালকের সহকারীর কাজ করেন। সংসারে খুব অভাব। তাই ক্লিনিকের টাকা জোগাড় করতে পারেননি বলেই ক্লিনিকে যাননি। রুহুল আমিন দাবি করেন, আবার কন্যাসন্তান হওয়ায় স্ত্রী–সন্তানের খোঁজ নেননি, এ অভিযোগ সত্য নয়। দ্রুতই স্ত্রী–সন্তানকে বাড়ি নিয়ে আসবেন বলে জানান।
প্রসূতি মা ও শিশুকে তাঁর মায়ের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ওই শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কন্যাসন্তান ও মাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ওই মা ও শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।রেকসোনা খাতুন, ইউএনও, কেশবপুর, যশোর
ক্লিনিকের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ওই নবজাতক ও প্রসূতির কোনো খোঁজখবর নিচ্ছিলেন না তাঁর পরিবারের লোকজন। এ অবস্থায় কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি (জাহিদুল)। ক্লিনিকের পুরো বিল মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। ইউএনও জানতে পেরে সন্তানসহ ওই প্রসূতিকে তাঁর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ইউএনও রেকসোনা খাতুন বলেন, প্রসূতি মা ও শিশুকে তাঁর মায়ের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ওই শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কন্যাসন্তান ও মাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ওই মা ও শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা সব সময় অবহেলিত থাকে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা অনেক সময় অবহেলিত থাকে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। সেই বিবেচনা থেকেই তিনি এ উদ্যোগ নেন।
সাজেদার মা রাফিজা বিভিন্ন বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। তিনি বলেন, তাঁর জামাতা স্ত্রী–সন্তানের তেমন খোঁজ নেয় না। প্রথম সন্তানের জন্মের সময়ও হাসপাতালের খরচ দেয়নি। রাফিজা আরও বলেন, ৮ জুলাই ভর্তি হওয়ার পর গত রোববার পর্যন্ত তিনি ক্লিনিকে মেয়ের পাশে ছিলেন। কাজের ব্যস্ততা থাকায় শেষ দুই থেকে তিন দিন খোঁজ নিতে পারেননি। তাঁর মেয়ে যাতে শ্বশুরবাড়ি ভালো থাকতে পারে ইউএনও সে ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়ে গেছেন।