হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত, সরকার–রাষ্ট্র কারও কাছে কিছু চাওয়ার নেই শাওনের
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ রোববার দুপুরে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে তাঁর কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এ সময় তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, ‘সরকার, রাষ্ট্র কারও কাছেই আমার কিছু চাওয়ার নাই, আগেও চাওয়ার ছিল না হুমায়ূন আহমেদের জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতে উনাকে নিয়ে কিছু পালন করবার।’
আজ দুপুর ১২টায় নুহাশপল্লীর লিচুতলায় মেহের আফরোজ তাঁর দুই ছেলে নিনিত ও নিষাদ হুমায়ূনকে নিয়ে কবর জিয়ারত করেন। এ সময় হুমায়ূন আহমেদের ভক্তরা উপস্থিত ছিলেন। লেখকের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করা হয়। আয়োজন করা হয় কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিলের।
কবর জিয়ারত শেষে মেহের আফরোজ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন আজ ১৪ বছর। গত ১৪ বছরে শুধু আমরা নুহাশপল্লীর কর্মীরা মিলেই হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন এবং মৃত্যুদিন একদম নিয়মিত পালন করেছি। ১৪ বছরের প্রতিটি সময় আমি আমার পরিবার নিয়ে ছিলাম, আমার সহকর্মীরা নুহাশপল্লীর সবাই মিলে ছিলাম। আশা ছিল, এখন কোনো আশাও নাই, কোনো চাওয়া নাই কারও কাছে। আমরা তাঁর জন্ম-মৃত্যুদিবস পালন করে যাব, যত দিন আমরা বেঁচে থাকব বা যত দিন নুহাশপল্লীর একটি কর্মীও থাকবে অথবা নুহাশপল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত–কর্মী যত দিন থাকবে।’
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংগ্রহশালা বা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে মেহের আফরোজ বলেন, ‘নুহাশপল্লীতে (লাইব্রেরি) আছে, আরও কয়েকটি জায়গায় লাইব্রেরি আছে। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত লাইব্রেরি এখনো করা হয়নি। আমরা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত লাইব্রেরি করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। অনেকে বই নেয়, বই ফেরত দেয় না। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রথম প্রকাশিত কপিও ছিল, সেগুলো যখন কেউ শার্টের ভেতরে করে নিয়ে চলে যায়, তখন আসলে খুব কষ্টের ব্যাপার হয়। তাই তাঁর বইয়ের সংগ্রহ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা এখনো নেই।’
প্রতিবারের মতো এবারও হুমায়ূনের ভক্ত, কবি, লেখকেরা ফুল হাতে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন নুহাশপল্লীর লিচুতলায়। লেখকের প্রিয় চরিত্র হলুদ পাঞ্জাবিতে হিমু এবং নীল শাড়িতে রূপা সেজে আসেন ভক্ত ও পাঠকেরা। তাঁরা লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা জানান।
মোসা. খাদিজা নামের এক ভক্ত ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের অমর সৃষ্টি নাটক-সিনেমাগুলো তাঁর ছেলে নুহাশ হুমায়ূন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন। উন্নত রেজোল্যুশনে মুভিগুলো সংরক্ষণ করতে পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারত আমরা এক বিস্ময়কর লেখক পেয়েছিলাম।’
হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত সংগঠন হিমু পরিবহনের হেলপার (সদস্য) দ্বীপ দাস বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে তাঁরা ক্যানসার সচেতনতা ক্যাম্পেইন, ম্যারাথন, হিমু-রূপা উৎসব ও তাঁর জন্ম-মৃত্যুদিবসে নানান আয়োজন করে থাকি। বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই লেখকের স্মরণে আমরা ভবিষ্যতেও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা করে যাব। সংগঠনের কার্যক্রম আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। ২০১২ সালে ১৯ জুলাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে মারা যান।
তাঁর লেখা এখনো সব বয়সী পাঠকের কাছে গ্রহণীয়
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম প্রয়াণদিবস পালন করা হয়েছে। আজ সকালে কেন্দুয়ার কুতুবপুর গ্রামে লেখকের নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে কোরআন খতম, কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, শোক শোভাযাত্রা, লেখকের অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া, বৃক্ষরোপণ, কুইজ প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কন, দেয়ালিকা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়েছে।
শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক শরীফ আনিস আহমেদ, সহকারী শিক্ষক শাহজাহান কবীর, সহকারী শিক্ষক তুহিন সরকার, সহকারী শিক্ষক মাহবুব আলম, পরিবারের পক্ষে তাঁর চাচা বখতিয়ার আহমেদ আযম প্রমুখ।
শিক্ষক শাহজাহান কবীর বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ স্যার অবহেলিত এই এলাকার মানুষকে আলোর পথ দেখাতে নিজ হাতে বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে এই শহীদ স্মৃতি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি। বিদ্যালয়টি নিয়ে তাঁর অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে এসএসসিতে অংশ নেওয়া প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই ভালো ফল অর্জন করছে।’
হুমায়ূন আহমেদের স্বজন বখতিয়ার আহমেদ আযম বলেন, হুমায়ূন আহমেদ সারা জীবন মানবমুক্তির জয়গান গেয়ে গেছেন। তাঁর কাছে সব মানুষ সমান ছিল। তাঁর লেখা এখনো সব বয়সী পাঠকের কাছে গ্রহণীয়। কারণ, তিনি একজন প্রকৃত শিল্পী ছিলেন। তাই তিনি মাটি, বাতাস, রোদ-বৃষ্টি ও প্রকৃতির ঘ্রাণ উপলব্ধি করতেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বই যে একটি পড়ার বিষয়, এটি হুমায়ূন আহমেদ স্যার মানুষকে উপলব্ধি করাতে পেরেছিলেন। তিনি একটি পাঠকসমাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর তিনি শুধু পাঠকই তৈরি করেননি। একজন মানুষ হিসেবে যে ব্যাপকতা, তা তিনি জীবনভর ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। স্যারের জীবন ও আদর্শকে অনুসরণ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তুলে ধরতে আমরা এই আয়োজন করে থাকি।’