সরাইলে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে চার গ্রামের বাসিন্দাদের
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের পালপাড়া, পানিশ্বর, শাখাইতি ও শোরবাড়ি—এই চার গ্রাম মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত। প্রতিবছরের মতো এবারও এসব গ্রামের প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে অর্ধশতাধিক পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অব্যাহত ভাঙনে গত চার দশকে এই চার গ্রামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ ৯-১০ বছর ধরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। শুধু গত চার বছরে নদীভাঙনে শোরবাড়ি গ্রামের ১০টি, পানিশ্বর গ্রামের ৫টি এবং শাখাইতি গ্রামের ১৪টি চাতাল বিলীন হয়েছে। এতে কাজ হারিয়েছেন সহস্রাধিক চাতালশ্রমিক। একই সময়ে এ চার গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার পুরোপুরি ভিটেছাড়া হয়েছে। শতাধিক পরিবার আংশিক ভাঙনের শিকার হয়েছে। এ বছর এখনো বড় স্থাপনা নদীতে বিলীন না হলেও নদীর তীর ভাঙতে শুরু করেছে।
অব্যাহত ভাঙনে গত চার দশকে এই চার গ্রামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ ৯-১০ বছর ধরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। শুধু গত চার বছরে নদীভাঙনে শোরবাড়ি গ্রামের ১০টি, পানিশ্বর গ্রামের ৫টি এবং শাখাইতি গ্রামের ১৪টি চাতাল বিলীন হয়েছে।
গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে ভাঙনকবলিত মানুষের সঙ্গে কথা হয়। পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ধীরেন্দ্র পালের বয়স নব্বইয়ের বেশি। তিনি আক্ষেপ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা-জেঠাদের আমলে আমাদের বসতবাড়িটি ছিল তিন কানি (৩০ শতকে এক কানি), এখন আছে ৩ শতক। যেভাবে ভাঙতেছে মনে অই জন্মভিটায় মরতেও ফারুম না।’
পালপাড়া গ্রামের মাঝখানে ১৭ কানির একটি পুকুর ছিল বলে জানান ধীরেন্দ্র পাল। পুকুরের চারপাশে ছিল বসতি ও কৃষিজমি। এখন সবই স্মৃতি। ভাঙনের ফলে কিছুই নেই আর। তিনি বলেন, গত ৪০-৪৫ বছরে এই এলাকার ৫০০-৬০০ পরিবার গ্রাম ছেড়েছে। এখন বসবাস করছে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার। বাঁধ না হলে তাদেরও একই দশা হবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
শাখাইতি গ্রামের বাসিন্দা ওসমান গণি চৌধুরী (৭৪) ও সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়া (৪৫) প্রথম আলোকে বলেন, গত তিন-চার বছরে নদীভাঙনে ২৫ থেকে ৩০টি চাতাল, একটি মসজিদ, মাজার, কবরস্থান, কৃষিজমিসহ বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। আরও কিছু বসতবাড়ি বিলীনের পথে। নদীভাঙন রোধ করা না গেলে অচিরেই পানিশ্বর বাজার, পানিশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শাখাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শোরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
পালপাড়া থেকে শোরবাড়ি পর্যন্ত ১ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য পাউবো ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয় থেকে ৬০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে সেখানে কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করেন তিনি।আকাশ দত্ত, নির্বাহী প্রকৌশলী, পাউবো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়
ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ
বছরের পর বছর ধরে এখানে নদীভাঙন চললেও তা রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৌহিদ মিয়া। গ্রামগুলো রক্ষা করতে এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
গ্রাম চারটি রক্ষার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করেছেন বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুত ছিল সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া। এ জন্য গত মার্চে পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে ডিও (আধা সরকারি পত্র) লেটার দিয়েছি। বাঁধ না হওয়া পর্যন্ত আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত বলেন, পানিশ্বর এলাকায় নদীভাঙন রোধে আপাতত ৮৫ লাখ টাকা মূল্যের ১৯ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া পালপাড়া থেকে শোরবাড়ি পর্যন্ত ১ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য পাউবো ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয় থেকে ৬০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে সেখানে কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করেন তিনি।