‘যারা ব্রয়লার খাইত, তারা এখন ব্রয়লারের চামড়া খায়’
ব্রয়লার মুরগির দোকানে জবাই করা মুরগির চামড়া ছাড়িয়ে স্তূপ করে রাখলেন তরিকুল। এরপর চাপাতির আঘাতে আস্ত মুরগি ছোট ছোট টুকরা করতে লেগে পড়লেন। এর ফাঁকে এক নারী এসে তরিকুলকে কিছু একটা বললেন। তিনি কাজ ফেলে মুরগির ছাড়ানো চামড়াগুলো এক এক করে গুনে তুলে দিলেন ওই নারীর হাতে থাকা বাজারের ব্যাগে।
ওই নারীর নাম ফাতেমা বেগম। বাড়ি ঠাকুরগাঁও শহরের রোড এলাকায়। গতকাল বুধবার সকালে কথা হলে ফাতেমা বলেন, দুই-আড়াই মাস আগে বাজারে ১ কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। সে সময় পরিবার নিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুই বেলা ব্রয়লার মুরগি খেতে পারতেন। হঠাৎ করে সেই ব্রয়লার মুরগির কেজি হয় ১৬০ টাকা। এরপর ২০০ থেকে ২২০ টাকা। সেই থেকে তাঁদের পাতে মুরগির মাংস আর উঠছে না। কিন্তু বহু দিনের অভ্যাস, তাই মাংসের স্বাদ পেতে মুরগির চামড়া কিনে খেতে শুরু করলেন। এখন অবশ্য ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমেছে, প্রতি কেজি ১৭০ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমলেও বাজারে চাল, ডাল, আটা, লবণ, তেল, চিনি, মসলাসহ সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তাই ফাতেমার বাজার খরচ বেড়ে গেছে। আর এতে তাঁকে অনেক হিসাব করে সংসার চালাতে হচ্ছে। ফাতেমা তাই ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার অভ্যাসে ফিরতে পারেননি।
ফাতেমার স্বামী কৃষিশ্রমিক। তাঁর আয়েই চলে সংসার। তাঁদের চার মেয়ে। বড় তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছোট মেয়ে বুলবুলি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।
তরিকুলের দোকানে সোনালি মুরগি কিনতে এসেছেন রানী বেগম (২৮)। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এক মেয়ে আর মাকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে তাঁর বসবাস। মুরগির দাম শুনে চুপসে গেলেন তিনি। কাটা ব্রয়লার মুরগির দাম শুনে দর-কষাকষি করে আধা কেজি মাংস কিনে নিলেন। রানী বলেন, ‘আগে ১০০ টাকার তরকারি আর ২০০ টাকায় ১টা ব্রয়লার মুরগি কিনলে ২ থেকে ৩ দিন চলে যেত। আর এখন এক দিনই যায় না। সব জিনিসের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের জীবন চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। পাতে মাংস জোটে কেমন করে?’
তরিকুলের পাশে কাটা ব্রয়লার মুরগির দোকান মো. লিটনের। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রওশন আরা বেগম। দিনমজুর স্বামীর রোজগারে পাঁচ সদস্যের পরিবার চলে। ইচ্ছা থাকলেও একটি পুরো ব্রয়লার মুরগি কেনার টাকা জোটাতে পারেন না তিনি। বলেন, ‘টুকরা মুরগি বিক্রি হচে (হচ্ছে) দেখিয়া, হামার ভালোই হইচে। কনেক মাংস তো খাবা পারছু। আর সেখান না পারিলেও মুরগির চামড়ি (চামড়া), পা ধরে যায়ে ছোয়ালাক শান্ত করিবা পারছু।’
কাটা ব্রয়লার মুরগির দোকানি তরিকুল বলেন, বাজারে এখন প্রতি কেজি মুরগির দাম ১৭০ টাকা। আর প্রতি কেজি কাটা মুরগির দাম ২৬০ টাকা। প্রতি কেজি দেশি মুরগি ৪০০ টাকা, সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়। একেকটা ব্রয়লার মুরগির ওজন দুই থেকে তিন কেজি। এখন বাজারে ১ কেজির দাম ১৭০ টাকা করে ২ কেজির দাম পড়ে ৩৪০ টাকা। এত টাকায় অনেকেই আস্ত মুরগি কিনতে পারেন না। তাই যাঁর যতটুকু লাগে, তিনি ততটুকু কাটা মুরগি কিনে নেন। কেউ ২৫০ গ্রাম, আবার কেউ আধা কেজি হাড়-চামড়া ছাড়া ব্রয়লার মুরগির মাংস কিনছেন। এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘যারা সোনালি মুরগি খাইত, তারা এখন ব্র্রয়লার খায়। আর যারা ব্রয়লার খাইত, তারা ব্রয়লারের চামড়া খায়। প্রতিটি ব্রয়লার মুরগির চামড়ার দাম পাঁচ টাকা।’