ফুটবল জোয়ারে চাপা পড়ল সার্ফিংয়ের সুখবর, এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেন মান্নান-ফাতেমা
বিশ্বকাপ ফুটবলের জোয়ারে ভাসছে পুরো দেশ। সেই জোয়ারে চাপা পড়ে গেছে বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের সাফল্যের গল্প। কক্সবাজারের সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার প্রথমবারের মতো জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে এই গেমস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নিয়মিত সার্ফিং করেন ১৭ নারীসহ অন্তত ৭০ জন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে সার্ফাররা নেমে যান অনুশীলনে। উঁচু ঢেউয়ের মাথায় সার্ফারদের কসরত একসময় বিদেশের চলচ্চিত্রেই কেবল দেখা যেত। এখন কক্সবাজারেও এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দীগন্তজোড়া নীল জলরাশি আর ঢেউ কেটে এগিয়ে চলা সার্ফারদের দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকেরা। ঢেউয়ের চূড়ায় ভারসাম্য রেখে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চল সার্ফার তরুণ-তরুণীরা সৈকতের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রাও যোগ করছেন।
বিশ্বমঞ্চে মান্নান ও ফাতেমা
কক্সবাজারের সার্ফিং জগতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই নাম মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমস সার্ফিং ইভেন্টে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন এই দুই অদম্য তরুণ-তরুণী। কলাতলী গ্রামের দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা মান্নান ও ফাতেমার গল্পটি অনুপ্রেরণার এক দারুণ উপাখ্যান।
গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কলাতলীয়তে গেলে কথা হয় সার্ফার মোহাম্মদ মান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল ভিন্নধর্মী কিছু করার। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে আজ এশিয়ান গেমসের মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।’
সার্ফার ফাতেমা আক্তারও নানা বাধা ডিঙিয়ে আজ এতটুকু এসেছেন। তিনি বলেন, ‘শুরুতে সার্ফিং কী, সেটাই বুঝতাম না। এখন বড় ঢেউ না পেলে আমার দিনই কাটে না। সার্ফিং যেন রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।’
কক্সবাজারের সার্ফিং জগতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই নাম মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমস সার্ফিং ইভেন্টে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন এই দুই অদম্য তরুণ-তরুণী। কলাতলী গ্রামের দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা মান্নান ও ফাতেমার গল্পটি অনুপ্রেরণার এক দারুণ উপাখ্যান।
দুই সার্ফারের কোচ ও বাংলাদেশ বয়েজ অ্যান্ড গার্লস সার্ফিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা রাশেদ আলম। সার্ফার টিম নিয়ে প্রতিদিন ভোরে তিনি হাজির হন কলাতলী পয়েন্টে। রাশেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মান্নান ও ফাতেমা গত এপ্রিল মাসে কক্সবাজার সৈকতে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাঁদের জন্য এখন প্রয়োজন নিবিড় প্রশিক্ষণ। এশিয়ান গেমসে তাঁরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন, এই স্বপ্ন নিয়ে আমরা লড়ে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকারি সহায়তা পেলে বাংলাদেশের সার্ফাররা বিশ্বমঞ্চে স্বর্ণ জয় করতে সক্ষম।’
বিশ্বের সেরা সার্ফিং গ্রাউন্ড
সার্ফারদের মতে, কক্সবাজার সৈকত সার্ফিংয়ের জন্য অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি উপযোগী ও নিরাপদ। এ জন্য এখান থেকে সার্ফাররা উঠে আসছেন। এটি দেশের সার্ফারদের প্রধান প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডও। কক্সবাজারের তরুণ সার্ফার ও বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, সার্ফিংয়ের মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় দেশের নাম থাকলেও কক্সবাজারের সৈকত সম্পূর্ণ আলাদা ও নিরাপদ। অনেকের ধারণা সার্ফিং শুধু পাথুরে বা প্রবালবেষ্টিত সৈকতেই হয়। কিন্তু সেই সব জায়গায় ঢেউ থেকে পড়ে গেলে তীক্ষ্ণ পাথরের আঘাতে শরীর কেটে রক্তাক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া অনেক জায়গায় হাঙরের ভয় থাকে। কিন্তু কক্সবাজারের সৈকত প্রাকৃতিকভাবেই বালুময়। এখানে প্রবাল বা পাথরের কোনো অস্তিত্ব নেই, ফলে নতুনদের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ সার্ফিং জোন।
কক্সবাজারে বেড়াতে আসা অস্ট্রেলিয়ান পর্যটক পেড্রিক হার্সও সার্ফারদের অনুশীলন দেখে মুগ্ধ। তিনি নিজেও সার্ফিং করতে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি পৃথিবীর অনেক পাথুরে সৈকতে সার্ফিং করেছি, কিন্তু কক্সবাজারের বালুময় সৈকতে সার্ফিং করাটা অন্য রকম আরামদায়ক। এখানে ঢেউগুলো সার্ফিং শেখার জন্য একদম নিখুঁত।’
সার্ফিং দেখে মুগ্ধ পর্যটক
উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে সার্ফারদের মিতালি দেখে মুগ্ধ পর্যটকেরা। সাগরের নীল জলরাশির ওপর ঢেউয়ের চূড়ায় সার্ফারদের ক্ষিপ্র গতি আর ভারসাম্য রক্ষায় দক্ষতা দেখতে সকালে কলাতলী সৈকতে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। অনেকে এই দৃশ্যের ছবি তোলেন। কলাতলী সৈকতে দাঁড়িয়ে সার্ফিং দেখছিলেন কুমিল্লার কলেজছাত্র মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কিশোর বয়সে টেলিভিশনের পর্দায় বিদেশিদের সার্ফিং দেখে মুগ্ধ হতাম। কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে এসে নিজের চোখে সার্ফিং দেখলাম। সার্ফিং শেখার খুব ইচ্ছা।’
সার্ফিংয়ে আগ্রহী মানুষজনের সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামো না থাকায় এই খেলার প্রসার ঘটছে না। কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘প্রতিবছর প্রায় ৭০-৮০ লাখ পর্যটক এখানে আসেন। তাঁদের একটি বড় অংশ সার্ফিং দেখে মুগ্ধ হন এবং শিখতে চান, কিন্তু অবকাঠামো এবং সার্ফিং উপকরণের অভাবে সেটা সম্ভব হয় না।’
সার্ফার শবে মেহেরাজ বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে এই সৈকতে সার্ফিং করছি। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক সার্ফিং দেখে মুগ্ধ হলেও এই জলক্রীড়ার ভবিষ্যৎ দেখছি না। বিশেষ করে মেয়েদের সার্ফিং করতে ঝুঁকি নিতে হয়। সমাজের কিছু লোক মেয়েদের সার্ফিংকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। মেয়েদের জন্য পৃথক সার্ফিং ক্লাব গড়ে তোলা গেলে অনেকে সার্ফিং শেখার সুযোগ পেত।’
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকারি ও ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের সার্ফাররা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার সুযোগ পেত।