কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় থেকে পাওয়া আরেকটি তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জেলায় মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৩ মেট্রিক টন। সে সময় খাদ্যের চাহিদা ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার ৬০ মেট্রিক টন। সব বাদ দিয়ে জেলায় ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৫০৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত ছিল। জেলায় মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ২ হাজার ৮৮০ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৬২ হাজার ১৯০ হেক্টর ও তিন ফসলি জমি ৮২ হাজার ৩৭৩ হেক্টর। আর তিনের অধিক ফসল ফলে ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। আর কৃষক পরিবার রয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬৭০টি ।

কৃষকেরা বলছেন, আবহাওয়া আর মাটির ধরনের কারণে জেলায় ধান, গম, আলু ও সবজি উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। গম উৎপাদনে দেশের সর্বোচ্চ আর আলুতে অবস্থান দেশে দ্বিতীয় এ জেলার। এ ছাড়া এখানে ভুট্টা ও সবজির ভালো আবাদ হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২২ সালের মৌসুমে জেলায় ৪৫ হাজার ১৯২ হেক্টর জমিতে গম আবাদ হয়েছে। আর উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭২১ মেট্রিক টন। উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার ও আবহাওয়া গম আবাদের অনুকূলে থাকায় জমির পরিমাণ কমলেও হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে। এদিকে গমের চেয়ে কম পরিচর্যা ও কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ায় ভুট্টা চাষে জেলার কৃষকেরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ বছরের খরিপ মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদ হয়েছে। এই জমি থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৯ মেট্রিক টন ভুট্টা পাওয়া গেছে।

জেলায় গত মৌসুমে ২৭ হাজার ৬৭৭ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। কৃষকেরা ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৮৪ মেট্রিক টন আলু ঘরে তোলেন। জেলায় ১৬টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে ১ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। কৃষকেরা হিমাগারে উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণ করে সারা বছর এ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার চাহিদা মেটান। এ ছাড়া জেলায় বেগুন, করলা, শসা, চিচিঙ্গা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ নানা শাকসবজি উৎপাদন হয়।

রানীশংকৈল উপজেলার বনগাঁও গ্রামের বাবলু রহমান শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন। তিনি বলেন, এই এলাকার কৃষকেরা আমন ধান একটু আগেই লাগান। বাজারে আগাম এক কেজি আলুর দাম সব সময়ই ৪০ থেকে ৫০ টাকার বেশি থাকে। ফসলের ভালো দাম পাওয়ায় দিন দিন চাষাবাদে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

সদর উপজেলার নারগুন কহরপাড়ার কৃষক সাদেকুল ইসলাম বলেন, গ্রামের কৃষকেরা বাড়ির আঙিনায়, ফলের বাগানে ‘সাথি ফসল’ হিসেবে সবজি চাষ করেন। পাশাপাশি ধানখেতের জমির আইলে সবজি চাষ করেন তাঁরা। এতে কৃষকেরা লাভ বেশি পাচ্ছেন। উৎপাদিত উদ্বৃত্ত সবজি ফড়িয়ারা খেত থেকে কিনে পাঠিয়ে দেন দেশের অন্য এলাকায়।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার পর্যন্ত জেলার খাদ্যশস্যের ১৩টি সরকারি গুদামে ৪১ হাজার ৯৮০ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল ও ১০০ দশমিক ৪৭১ মেট্রিক টন গম মজুত ছিল।

কৃষি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা পেয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক মেহেদী আহসান উল্লাহ চৌধুরী। জেলায় খাদ্য উদ্বৃত্তের অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কৃষক ও কৃষি বিভাগসহ সবার সমন্বিত পরিশ্রমে আমাদের জেলা খাদ্যে উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। আমরা এটা ধরে রাখতে চাই।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল আজিজ বলেন, দেশের জনসংখ্যা বেড়েই চলছে। পাশাপাশি কৃষিজমি কমছে। এ অবস্থায় এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। এ জন্য তাঁরা এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি এবং দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া জমিতে সমন্বিত চাষের প্রবণতা বেড়েছে। যে কারণে ফসল উৎপাদন হচ্ছে বেশি। তিনি আরও বলেন, খাদ্যে শুধু উদ্বৃত্ত হলে চলবে না। এখন খাদ্যনিরাপত্তার কথাটিও ভাবতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা বলতে বোঝায়, একটি দেশের সব নাগরিকের সব সময়ের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান। সব মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপদ করতে না পারলে, খাদ্য উদ্বৃত্তের কোনো মূল্য নেই।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এ ছাড়া আরও খাদ্যশস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।