ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম সংসদ অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী বৃহস্পতিবার। নির্বাচনে জয়ী হওয়া ২৯৬ সংসদ সদস্যর শপথও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঝুলে আছে চট্টগ্রামের দুটি আসনের প্রার্থীদের ভাগ্য।
আসন দুটি হলো চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড)। এই দুটি আসনের বিএনপি প্রার্থীরা হলেন যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর ও মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। নির্বাচনে তাঁদের ফলাফল প্রকাশ আদালতের সিদ্ধান্তে স্থগিত রয়েছে। ফলাফল এবং গেজেট কখন প্রকাশ করা হবে, তা নির্ভর করছে আদালতের আদেশের ওপর। এর মধ্যে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলে প্রথম অধিবেশনে তাঁদের অংশ নেওয়ার সুযোগ কার্যত নেই।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেটও প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। তবে এই দুই আসনে বিএনপির দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর মামলা চলতি সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তাঁর প্রতিনিধি। তবে সরোয়ার আলমগীরের মামলার শুনানি রয়েছে আগামী এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল মারা যাওয়ায় এখন সেখানে উপনির্বাচন হবে। উপনির্বাচন হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া বগুড়া-৬ আসনেও।
নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসন নিয়ে ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের আদেশের আলোকে দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন। তবে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় কমিশন ফলাফল স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর মামলা চলতি সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তাঁর প্রতিনিধি। তবে সরোয়ার আলমগীরের মামলার শুনানি রয়েছে আগামী এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে।
আদালত, নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য জানান, চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ার আলমগীর ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল দায়ের করা হয়েছিল। মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিক এবং সরোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে একই আসনের জামায়াতে প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন অভিযোগ করেছিলেন। আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও পৃথক আপিল করে।
উদ্ধৃতি: আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে জনগণ আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন। নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর চেয়ে ৮০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছি আমি।
গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) শুনানিতে মো. আনোয়ার ছিদ্দিক ও ব্যাংকের আপিল খারিজ করে। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। তবে ইসির সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে মো. আনোয়ার ছিদ্দিক ও ব্যাংক পৃথক রিট করেন। শুনানি নিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দেন। এর ফলে প্রার্থিতা বহাল থাকে আসলাম চৌধুরীর।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে মো. আনোয়ার ছিদ্দিক ও সংশ্লিষ্ট যমুনা ব্যাংক আপিল বিভাগে আবেদন করে, যা গত ২৯ জানুয়ারি চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত আবেদন আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি পেয়ে মো. আনোয়ার ছিদ্দিক লিভ টু আপিল করেন। এই লিভ টু আপিল ও ব্যাংকের করা আবেদনের ওপর গত ২ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেন আপিল বিভাগ। আদালত আদেশ দেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকবে, ফলাফল প্রকাশ হবে না।
যোগাযোগ করা হলে আসলাম চৌধুরীর জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিগত সহকারী ও বিএনপি নেতা আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, আগামী সোম-মঙ্গলবারের মধ্যে আদালতের চূড়ান্ত আদেশ পাবেন বলে আশা রয়েছে তাঁদের। ইতিমধ্যে তাঁদের প্রার্থীর বিরুদ্ধে যাঁরা অভিযোগ এনেছিলেন তাঁরা তা প্রত্যাহার করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীও অনাপত্তি দিয়েছেন। তাই আদালতের আদেশ পাওয়ার পরপরই নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবেন বলে আশাবাদী।
তবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ঋণখেলাপির অভিযোগ আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে চারটি ব্যাংক অভিযোগ করেছিল। নির্বাচনের আগেই তিনটি ব্যাংক অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। একটি ব্যাংক অভিযোগ প্রত্যাহার করেনি। তাঁর অভিযোগ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও ঠিক নয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যদি অভিযোগ তুলে নেয় তাহলে তাঁর অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। আর আদালতে কবে নাগাদ শুনানি হতে পারে তা তাঁর জানা নেই।
আদালতের দিকে তাকিয়ে সরোয়ার
রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে। তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর বৈধতা নিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সরোয়ার আলমগীর গত ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন।
শুনানি নিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল দিয়ে সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিলের নির্বাচন কমিশনের (ইসির) সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ও ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন নুরুল আমিন। সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থীর করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি আদেশের পর সরোয়ার আলমগীরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, লিভ (আপিল করার অনুমতি) দিয়েছেন আপিল বিভাগ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সরোয়ার আলমগীর। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। এই আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।
যোগাযোগ করা হলে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অভিযোগ করেছিলেন। আদালতের আদেশে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আগামী ২৮ এপ্রিল এই মামলা নিয়ে শুনানি রয়েছে। আপাতত ওই দিনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে এর মধ্যে আদালতের আদেশের প্রত্যয়িত কপি পেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তিনি বলেন, ‘আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে জনগণ আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন। নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর চেয়ে ৮০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছি আমি।’
চট্টগ্রাম-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ঋণখেলাপির তথ্য গোপনের অভিযোগটি এখনো আদালতে বিচারাধীন। এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আগামী ২৮ এপ্রিল শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। শুনানি এগিয়ে আসার কিংবা পিছিয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য নেই।